প্রতীক ওমর
কাক ডাকা ভোর। হেমন্তের কুয়াশায় আকাশ ঢাকা। শীতের পরশ অনুভূত হয় শরীরে। পড়নে ছেঁড়া কাপড়। হাতে ব্যাগ আর খন্তি (মাটি খোড়ার হাতিয়ার)। গন্তব্য ফসলের মাঠ। উদ্যেশ্য ধানের জমিতে পড়ে থাকা এবং ইঁদুরের গর্ত থেতে ধান সংগ্রহ করা। ইঁদুরের সেই ধানেই নাতী নাতনীদের সাথে নিয়ে শীতের পিঠা খাবেন প্রায় ষাট বছর বয়সী আজিফা বেওয়ার। বগুড়ার সরিয়াকান্দি উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বড়ইকান্দি গ্রামের মৃত মুনু জায়দারের স্ত্রী আজিফা বেওয়া এমনটাই বললেন।
আজিফা বেওয়ার স্বামী মারা গেছেন প্রায় ৮ বছর পূর্বে। আবাদের জমি-জমা নেই। বাড়ির ছোট্ট জায়গাটুকুই তার একমাত্র সম্বল। তিন মেয়ে আর দুই ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। এর মধ্যে আবার ছেলে-মেয়ের পক্ষের নাতি-পুতি রয়েছে ৯ জন। ছেলেরা অন্যের দোকানে কাজ করে। যে মাইনে পায় তা দিয়ে তাদের দিন যাওয়াই কঠিন। ফলে নাতি-পুতিদের শীতের পিঠা-পুলি খাওয়ানোর সাধ্য হয়ে ওঠে না। এজন্যই ব্যাগ বস্তা সাথে নিয়ে মাঠে-মাঠে ঘুরছেন তিনি। জমিতে ঝরে পড়া ধান আর ইঁদুরের গর্তের ধান সংগ্রহ করছেন।
আজিফা বেওয়ার সাথে কথা হলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, গ্রামের প্রায় ঘরে এসময় পিঠা পায়েশের আয়োজন হয়। মেয়ে জামাইদের দাওয়াত দিয়ে রীতিমত উৎসব হচ্ছে। পিঠার ঘ্রাণে পুরো এলাকা মৌ-মৌ করে। এসময় সময় সবারই ইচ্ছে হয় পিঠের স্বাদ নেয়ার। আমার ঘরেও ছোট নাতি নাতনি আছে। তারা অন্যের বাড়ির দিকে চেয়ে থাকে। এমন অবস্থা দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। ভাত রান্নার চাল যোগাড় করা যেখানে কঠিন হয়ে পড়েছে সেখানে পিঠার আয়োজন কি করে করি? তেল চিনিও কেনার টাকা নেই ঘরে। মন কাঁদে কিন্তু গরীব বলে কিছুই করার থাকে না। কয়েক দিন আগে নাতি নাতনিরা পিঠা খাওয়ার জন্য জেদ ধরেছে। সেজন্যই উপায় না পেয়ে ইঁদুরের গর্তের ধান সংগ্রহের জন্য মাঠে নেমেছি। সারাদিন মাঠচষে বেরিয়ে কেজি দশেক ধান সংগ্রহ করা যায়। কয়েকদিন টানা ধান সংগ্রহ করে নাতি নাতনিদের পিঠে খাওয়ার চেষ্টা করবো। ওদের মুখে দুই একটি পিঠে তুলে দিতে পারলে আমার মনটা ভরে যাবে। শান্তি পাবো।
এদিকে ইঁদুরের গর্তে হাত দিয়ে ধান সংগ্রহ করা খুবাই ঝুঁকিপূর্ণ। সাপ-পেকামাকড় কামড় দিতে পারে। মাঝেমধ্যেই সাপে কাটার খবরও আসে। এমন নির্ঘাত ঝুঁকি নিয়ে আজিফা বেওয়ার মত অনেক অসহায় মানুষ ইঁদুরের গর্তে হাত দিচ্ছেন।
দেশের চলমান দৈন্যদশার কারণে অনেকেই দারিদ্র্রতার কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছেন। বাজার পরিস্থিতি দিনদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিত্যনৈমিত্তিক খরচ যোগাতে বেশিরভাগ মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন। আনন্দ আয়োজন কমে যাচ্ছে গ্রাম থেকে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠছে অনেকের কাছে। ঘরে ঘরে বেকার তরুণরা অসহায় হয়ে বসে আছে। চাকরির বাজারো চড়া। একেরপর এক পরীক্ষা ভাইভা দিয়েও কর্মসংস্থানের দেখা মিলছে না। যে সময় পরিবারকে সহযোগিতা করার কথা সে সময়ও অনেকে হাত খরচের টাকার জন্য পরিবারের দিকেই তাকাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রামে এখন আজিফা বেওয়াদের মত মানুষের এভাবে মাঠে মাছে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আইবিএ’ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী মানবজমিনকে বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভয়াবহ রকমের খারাপ যাচ্ছে। ‘নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে অস্বস্তিতে আছে সাধারণ মানুষ। প্রতিটি পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। মধ্যবিত্তরাও এখন দামের চাপে ব্যাগের তলানিতে পণ্য নিয়ে ফিরছে ঘরে। নিম্নবিত্তদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। দাম বাড়ার কোনো কারণ না থাকলেও মোটা চাল, আটা, ময়দা, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, মসুর ডালসহ প্রায় সব ধরণের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছেই। এসব পণ্যের চড়া দামে ক্রেতারা যেমন চাহিদার তুলনায় পণ্য কম কিনছে, তেমনি বিক্রেতাদেরও কেনাবেচা কমেছে। দাম শুনে অনেকে প্রয়োজনীয় পণ্য না নিয়েই ঘরে ফিরে যাচ্ছে। অনেকেই এক কেজির জায়গায় আধা কেজি নিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ নাজেহাল। খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রামাঞ্চল ও বস্তিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী সুষম খাদ্যা পাচেছ না বললেই চলে। বর্তমানে শহর-গ্রামগুলোতে শীতের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ার কথা। কিন্তু অর্থের অভাবে অনেক বাড়িতে পিঠার আয়োজন হচ্ছে না। উচ্চবিত্তদের বাড়িতে এই আয়োজ দেখা গেলেও নিম্নবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের বাড়িতে তেমন দেখা মিলছে না’। তিনি মনে করেন দেশের এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ ভয়াবহ একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে’।
মন্তব্য