প্রতীক ওমর
গ্রামের নাম ‘পাঁচখুর’। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ। প্রত্যন্ত অঞ্চল। কাহালু উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। ৫০ থেকে ৬০ পরিবার বাস করে ওই গ্রামে। সবাই শিল্পী। হাতের ছোঁয়ায় নিপুনভাবে তৈরি করেন হরেক রকমের তৈজসপত্র। কোথাও ইট বিছানো পথ আবার কোথাও মেঠোপথ। আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় গ্রামটিতে। গ্রামে প্রবেশ পথের দুইধারে সারিসারি দাঁড়িয়ে আছে শতশত তালগাছ। সেই তালগাছকে কেন্দ্র করেই পুরো গ্রামের মানুষ রুটি রুজির সন্ধ্যান করে। প্রায় দেড়‘শ বছরধরে গ্রামের মানুষ একযোগে তাল গাছের আঁশ দিয়ে বাহারী তৈজসপত্র তৈরি করেন। সেগুলো দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যায়। সেখান থেকে পাওয়া অর্থ দিয়েই দিব্যি চলে সংসার। সম্প্রতি ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বাঁধসাধে ‘পাঁচখুর’ গ্রামের হস্ত শিল্পীদের। তাদের তৈরি এসব পণের মোটা অংশ ইউক্রেনে যেতো বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ী ইউনুস আলী। মন্দায় মন খারাপ পাঁচখুর গ্রামের হস্ত শিল্পীদের।
ওই ব্যবাসায়ী মানবজমিনকে জানান, গ্রামের নারীদের হাতে তৈরি সামগ্রী এলাকায় তেমন চাহিদা না থাকলেও বিদেশে এর কদর রয়েছে। দিন দিন পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকায় পাঁচখুর গ্রামসহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের প্রায় তিনশ পরিবার তালের আঁশ দিয়ে শতাধিত রকমের সামগ্রী তৈরি করে থাকেন। গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই তালের আঁশ দিয়ে এসব সামগ্রী তৈরি হয়। সাংসারিক ছোটখাটো কাজে ব্যবহারের জন্য ও ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে এসব সৌখিন তৈজসপত্র তৈরি করে স্বচ্ছল হয়েছেন অনেকেই। আশপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে এ হস্তশিল্পের কাজ। ইউনুস আরো বলেন, ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধের বৈরী প্রভাব পড়েছে তাদের পল্লীতে। এখানকার তৈরি পণ্য দেশ দুটিতে যেতো। যুদ্ধের কারণে সেখানে আর যাচ্ছে না। ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন এই গ্রামের হস্ত শিল্পীরা।
পাঁচখুর গ্রামের ই্উনুস আলী এইসব পণ্য সংগ্রহ করে রফতানিকরকদের মাধ্যেমে দেশের বাইরে পাঠান।
গ্রামটিতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কেউ পেশা হিসেবে আবার কেউ শখের বসে ঘরে বসেই তৈরি করছেন সৌখিন এসব পণ্য। গ্রামের নারী পুরুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরাও অবসর সময়ে তাল গাছের আঁশ দিয়ে পণ্য তৈরি করেন। মাঝারি বয়সের তালগাছ থেকে পাতার ডাটা (স্থানীয় ভাষায় ডাকুর) সংগ্রহ করা হয়। পরে হাতুড়ি দিয়ে থেঁতলে নেওয়া হয়। তা থেকে সংগৃহীত আঁশ রোদে শুকানো হয়। শুকনো আঁশ দিয়ে একটির সাথ অপরটি পেঁচিয়ে বুননের মাধ্যমে বিভিন্ন রূপ দেওয়া হয়। ঘর সাজানোর সৌখিন এসকল পণ্য এক দিকে যেমন দেখতে সুন্দর, তেমনি পরিবেশবান্ধব। পঁচনশীল। এগুলো সহজেই মাটির সাথে মিশে যায়।

জার্মানি, ফ্রান্স, ইউক্রেন, ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড, সুইজারল্যন্ড, রাশিয়া, ইন্দেনেশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে রফতানি হচ্ছে। কারিগররা জানান কাজের সংসারের ফাঁকে এই তালের আঁশ দিয়ে তৈরি করেন বিভিন্ন পণ্য। প্রতিদিন তিন থেকে চারটি টেবিল ম্যাটসহ অন্যান্ন পণ্য তৈরি করেন তারা। একটা ম্যাটে ৩৫-৪০ টাকা পান। প্রতিদিন আয় হয় ১০০ / ১৫০ টাকা।
‘পাঁচখুর’ গ্রামের হস্তশিল্প’র ইতিহাস অনেক পুরাতন। যুগের পর যুগ ধরে এই গ্রামের বাসিন্দারা এই পেশার সাথে জাড়িত। পারিবারিকভাবে হাতের কারুকাজ ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় শিশু-কিশোরদের। অন্য এলাকা থেকে বউ হয়ে আসা মেয়েরা সময়ের ব্যবধানে শিখে নেয় এই কাজ। কৃষিকাজের ফাঁকে ফাঁকে প্রায় সব মানুষ এসব পণ্যতৈরি করে থাকেন।
পাঁচখুর গ্রামের প্রায় শতবর্ষী বৃদ্ধ ছহির উদ্দিনের সাথে কথা হয়। তিনি মানবজমিনকে জানান, তার দাদা এবং পিতাকে এসব কাজ করতে দেখেছেন। তিনিও যুবক বয়স থেকেই এসব কাজ করেছেন। তবে ঠিক কত বছর আগে থেকে তালের আঁশ দিয়ে পণ্যতৈরি শুরু তার সঠিক সময়কাল কেউ দিতে পারেনা। তবে ধারণা করা হয় কমপক্ষে ১৫০ থেকে ২০০ বছরধরে গ্রামের মানুষ এই শিল্পের সাথে জড়িত।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বগুড়ার উপব্যবস্থাপক একেএম মাহফুজুর রহমান বলেন, বিসিক এসব শিল্পের সাথে জড়িত থাকাদের নানা ধরণের সহযোগিতা দিয়ে আসছে। বিশেষ করে সল্প সুদে ঋণ প্রদান করে তাদের কাজকে আরো বেগবান করে থাকি আমরা।
তবে, কুঠির শিল্পের কারিগরদের অভিযোগ এই কাজ করতে তাদের যে, কষ্ট করতে হয় সেই তুলনায় মজুরী পান না তারা। বিপনন ব্যবস্থায়পনাতেও সরকারি কোন সহযোগিতা মেলেনা তাদের ভাগ্যে। ঋণ সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগও জোড়ালোভাবে উস্থাপন করেছেন কারিগর এবং ব্যবসায়ীরা।
মন্তব্য