পর্ব-এক: আওয়ামী লীগের পেটে জাপার দুর্গো
প্রতীক ওমর, রংপুর থেকে ফিরে:
রাজনৈতিক ট্রাম্প কার্ডের শিকার রংপুরের জাতীয় পার্টি। খোদ আতুর ঘরেই ছন্নছাড়া অবস্থা দলটির। হুশাইন মুহা: এরশাদের অবর্তমানে দৈন্যদশায় পড়েছে জাতীয় পার্টির মূল ভিত। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্পর্কের দূরত্ব খানিকটা ভবিয়ে তুলছে সমর্থকদেরও। এছাড়াও সিনিয়র নেতাদের দলীয় কাঠামো উন্নয়ণে কার্যকরি সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়া, পরামর্শের ভিত্তিতে সংগঠন না চালানো এবং পার্টির মূল দর্শন থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের সড়ে থাকায় অনেকটা বিলুপ্তির পথে রংপুরের জাতীয় পার্টি। মাঠপর্যায়ের নেতাদের সাথে কথা বলে এরশাদ বিনে জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থান জানার চেষ্টা করেছি। তিন পর্বের ধরাবাহিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
গেলো কয়েক দিন রংপুরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীদের সাথে কথা বললে বেরিয়ে আসে দলটির নানা অসংগিতর তথ্য। নিবেদীত নেতাকর্মীদের অবমূল্যায় করে দূরে সড়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য কিছু নেতা ব্যক্তিগতভাবে সরকারি সুযোগ সুবিধা নিয়ে সরকারের পক্ষে কথা বলে জনগণ থেকে জাতীয় পার্টিকে বিমুখ করেছে। দলীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের আখের গোছানোয় ব্যস্ত থাকছেন সরকারি সুবিধা ভোগী জাতীয় পার্টির এসব নেতারা। এমন অভিযোগও জোড়ালোভাবে তুলেছেন রংপুরের তৃণমূল নেতারা।
অনেকে বলেছেন মহাজোটের অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি মূলত এখন আওয়ামী লীগের পেটে ঢুকেছে। দলটিকে ক্রমান্বয়ে গিলে ফেলেছে সরকারি দল। দলের উচ্চ পর্যায়ের কিছু নেতাকে সরকার হাতে রেখে পুরো দলটাকে মেরুদন্ডহীন করে তুলেছে। এর ফলে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের ৩২টি আসনের মধ্যে জাতীয় পার্টি পেয়েছে মাত্র ৭টি আসন। বিএনপি পেয়েছে ১টি আর বাকি সবগুলো আসন আওয়ামী লীগের দখলে। অথচ এই অঞ্চলের ৩২ আসনের মধ্যে ২১ টি আসন ছিলো জাতীয় পার্টির দখলে।

রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াছির মানবজমিনকে বলেন, হুশাইন মুহা: এরশাদের সময়ে জাতীয় পার্টির অবস্থান খুব ভালোছিলো। বর্তমানে জাতীয় পার্টির আতুর ঘর অন্যকেউ দখল করে নিয়েছে। আমাদের ঘরে এখন অন্যকেউ বস করছে। রংপুরে আমাদের যে আসনগুলো ছিলো সেগুলো অনেকটা জোরকরে দখল করে নেয়া হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনেকরি বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশ নেই। এখন কেউ খোলামেলা রাজনীতি করতে পারছে না। যদি কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় তখন আবার মানুষ রাজনীতি করবে। বর্তমানে কোন রাজনৈতিক দলের ঘর আছে বলে আমি বিশ^াস করি না। কেবল মাত্র সরকারি দলের ঘরবাড়ি, আসন সব আছে। তারা ছাড়া আর কেউ দেশে রাজনীতি করতে পারছে না। আমরা কেবল সরকারের ঘরে আশ্রিত।
সরকার সব রাজনৈতিক দলকে ভয়ের মধ্যে রেখেছে। ন্যায় সংগত কোন চাওয়া পাওয়া নিয়েও সরকারে বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে স্বারকলিপি দেয়া যাবে না। এখানেও যদি ভয় দেখানো হয় তাহলে আমরা রাজনীতি করবো কিভাবে।
এস এম ইয়াছির আরো বলেন, সরকার জাতীয় পার্টির মেরুদন্ড খুলে অন্য যায়গায় রেখেছে। যখন দরকার হয় তখন আবার মেরুদন্ড লাগিয়ে খাড়া করে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আবার মেরুদন্ড খুলে রাখে।
হুশাইন মুহা: এরশাদের মৃত্যুর পর রংপুরের জাতীয় পার্টি কেমন আছে জানতে চেয়েছিলাম রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম সিদ্দিকীর কাছে। তিনি বলেন, হুশাইন মুহা: এরশাদ আমাদের যে জাতীয় পার্টি উপহার দিয়ে গেছেন সেটি কিন্তু সাধারণ মানুষের পার্টি। তার অবর্তমানে এই দলে কিছু অসাদু নেতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তারা দলটাকে নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছে। বিশেষ করে আমাদের কিছু কেন্দ্রীয় নেতা যারা পার্টির দায়িত্বপালন করছেন, তাদের অনেকেরই নির্বাচনে জয় পাওয়া দূরের কথা জামানতের অস্তিত্ব থাকবে না। এমন কিছু নেতা সব সময় চিন্তা করে জোটগতভাবে নির্বাচন করে বিনা ভোটে পাশ করার। এমন নেতাদের কারণে রংপুরের এখন মাত্র দুটি আসনের এমপি রয়েছে এই দলের। আবারো যদি সরকারের সাথে তালমিলেয়ে জোটগতভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতীয় পার্টি তাহলে সাধারণ জনগণ থেকেও বিচ্ছিন্ন হবে এই দল।

হুশাইন মুহা: এরশাদের সময়ের জাতীয় পার্টি আর বর্তমানের জতীয় পার্টির মধ্যে পার্থক্য কি জানতে চেয়েছিলাম কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আবুল মাসুদ চৌধুরী নান্টুর কাছে। তিনি বলেন, হুশাইন মুহা: এরশাদ জীবিত থাকালীন জাতীয় পার্টি আর বর্তমানের জাতীয় পার্টির মধ্যে বহু পার্থক্য দৃশ্যমান। আগের রমরমা পার্টির অবস্থান একেবারেই নেই। এরজন্য আমরা যারা দায়িত্বে আছি তারাই দায়ী। এর জন্য কর্মীরা দায়ি নয়। নেতাদের কারণেই মানুষের মন দিন দিন এই দল থেকে উঠে যাচ্ছে। এর পিছনের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রথমত সিদ্ধান্তহীতা। নেতারা একটা বিষয় নিয়ে আজকে এক কথা কাল আরেক কথা এমন কি সকাল বিকাল তারা কথার পরিবর্তন করে। ফলে মানুষের বিশ^াসের জায়গা, আস্থার জায়গা নষ্ট হতে থাকে। বর্তমানে এর প্রভাব চরমভাবে পড়েছে দলটির উপরে। তবুও তিনি মনে করেন, পার্টির হর্তাকর্তারা যদি নিজেদের সংশোধন করে জনগণের কাছে এখনো ফিরে আসেন তাহলে রংপুর অঞ্চলের মানুষ তাদের ফিরিয়ে দেবেন না।
আতুর ঘরে দুরাবস্থা কিভাবে সৃষ্টি হলো? সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হলো কি করে রংপুরের জাতীয় পার্টি এমন বিষয় নিয়ে আলাপ হয় জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার সাথে। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির সহযোগিতা নিয়ে বর্তমান সরকার বারবার ক্ষমতায় এসেছে। তারপরেও এই দলকে বিলুপ্ত করার জন্য বর্তমান সরকারের একটি সুপ্ত পরিকল্পনা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বগুড়া হলো বিএনপির ঘাটি। ওখানে শত চেষ্টা করেও জাতীয় পার্টির একটি আসনও পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ সেখানে আমাদের আসন দিয়েছে সরকার। রংপুরের ক্রিম আসনগুলোতে আমাদের না দিয়ে আওয়ামী লীগ নিয়েছে। এটি আওয়ামী লীগের সুদূর প্রসারী চিন্তা বলে আমি মনে করি। তারা পরিকল্পিকভাবে জাতীয় পার্টির দুর্গে হানা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের এমন চক্রান্ত যদি আমাদের কেন্দ্রীয় নেতারা না বোঝেন তাহলে হয়তো আর কখনোই জাতীয় পার্টি পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসতে পারেব না।
দ্বিতীয় পর্ব: কতিপয় নেতার হাতে জিম্মি জাপা
মাঠে নেই। কার্যক্রমেও নেই। তৃণমূল কর্মীদের সাথে নেই যোগাযোগও। ঢাকায় বসে সরকারের সাথে তালমিলিয়ে রাজনীতি করছেন। ফিরে তাকানোর সময়ও নেই তাদের হাতে। দল কোথায় গিয়ে ঠেকছে সেটিও দেখার প্রয়োজন মনে করেন না তারা। এমন কিছু নেতার হাতে গোটা জাতীয় পার্টি জিম্মি হয়ে আছে। এমনটাই দাবী করছেন খোদ রংপুরের নেতারা। মাঠপর্যায়ের নেতাদের সাথে কথা বলে এরশাদ বিনে জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থান জানার চেষ্টা করেছি। তুলে ধরছি এপার্বে।
একটা সময় ছিলো উত্তরজনপদের মানুষ রাজনীতি বলতে হুশাইন মুহা: এরশাদকেই বুঝতো। মার্কা মানেই মনে করতো লাঙ্গল। এর পিছনে কিছু কারণও ছিলো। বরাবরেই উত্তরাঞ্চল তথা গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারীসহ এই অঞ্চলের ৩২টি আসনের বেশির ভাগ দখলে ছিলো এরশাদের। হুশাইন মুহা: এরশাদ বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ছুটে যেতেন সাধারণ মানুষের কাছে। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বুক পানিতে নেমে বন্যার্তদের সহযোগিতা করার নজিরও ছিলো তার। মানবিক কাজের এমন বহু উদাহরণ এরশাদকে এই অঞ্চলের মানুষ হৃদয়ে স্থান দিয়েছিলেন। কালের আবহে সেই দলে ভাটা পড়েছে। নেতৃত্ব শুন্য হয়ে পড়েছে প্রায়। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় ফিগারের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়নি। দৃশ্যমান পটভূমিতে যারা দলটির হাল ধরেছেন তাদের কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ কর্মী সমর্থকদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় দায়িত্বপালনকারী নেতাদের সাথে তৃণমূলের নেতাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। দর্শনগত মতের অমিল, রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব এবং ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবনতা নেতাদের মধ্যে দৃশ্যমান। ফলে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছেন নিবেদীত নেতা কর্মীরা। অবমূল্যায়নের শিকার হয়ে দল বিমুখ হয়ে আছেন অনেক নেতা। এখন জাতীয় পার্টিরজুড়ে বইছে হতাশা বাতাস।

জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা এ্যাড. সালাহ্ উদ্দিন কাদেরীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম বর্তমান জাতীয় পার্টির হালচাল সম্পর্কে। তিনি বলেন, আমি এক সময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। যখন দেখলাম আমার আদর্শের সাথে ওই দলের মিল নেই তখন আমি ভুল বুঝতে পেরে সরে এসেছি। আমি এখন ওই দল নিয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই না। তবে আমরা আগে যে স্বচ্ছ রাজনীতির চর্চা দেখেছি সেই চর্চাটা আর নেই। রাজনীতি করতে হলে আগে নিজেকে সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সাধারণ মানুষ এবং কর্মী বান্ধব হতে হবে। বর্তমান রাজনীতিতে এমনটা দেখা যায় না। কতিপয় নেতা তাদের নিজেদের মত করে দল চালাচ্ছেন। ফলে কর্মী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন নেতারা। তিনি আরো বলেন, নেতা এবং কর্মীর মধ্যে বোঝাপড়া ভালো না থাকলে সেই দল বেশি দূর যেতে পারে না। সেই সাথে রাজনীতিতে মাঠ থেকে উঠে আসা নেতার অভাব চরমভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। হঠাৎ করেই অনেকে নেতা বনে যাচ্ছেন। কেউ ব্যবসায় করে, কেউ শিক্ষকতা করে, কেউ পুলিশের চাকরি করে রাতারাতি এমপি হচ্ছেন। তাদের হাতে যখন দলের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তখন আর ওই দল কর্মীদের মুখরিত কলরব শুনতে পায় না। তিনি জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থানকে এভাবেই ইঙ্গিত করেছেন।
রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম সিদ্দিকী বলেন, কর্মী ছাড়া নেতা অচল আর নেতা ছাড়াও কর্মীরা মূলহীন। রাজনীতির ক্ষেত্রে নেতা এবং কর্মীর একটা যোগ সূত্র আছে। দুইয়ের সমন্বয় না থাকলে কোন দলের রাজনীতিক কাঠামো থাকে না। জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে কিছু নেতা নিজেদের মত করে দল চালাচ্ছেন। কর্মীদের অবজ্ঞা করছেন। ফলে দিন দিন এই দল তার স্বকিয়তা হারাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, রাজনীতি না করে হঠাৎ দলের হাল ধরা নেতাদের সাথে এখন তৃণমূলের কর্মীদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কর্মীদের সাথে ব্যবধান সৃষ্টি করে কেন্দ্র নেতারা দলটা নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছেন।
কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আবুল মাসুদ চৌধুরী নান্টুর কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবিষয় নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে কোন লাভ নেই। কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলের বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করছেন না। তিনি মনে করেন, তাদের কাছে ব্যক্তিগত ক্ষমতাই মূল। তারা ক্ষমতায় আছেন ভালো আছেন। তৃণমূল নিয়ে মাথা ব্যাথা কম। যত দিন ক্ষমতা আছে ততোদিন তারাও থাকবেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন আচরণের প্রভাব তৃণমূলে শক্তভাবে পড়েছে বিধায় রংপুরে আসন সংখ্যা দুইয়ে নেমেছে।

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার বলেন, রংপুরের হারানো আসনগুলো উদ্ধার করতে এখনো কেন্দ্রীয় নেতাদের তেমন কোন পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। এখনো নির্বাচনের দেড় বছর সময় আছে। এখনি যদি কেন্দ্র সঠিকভাবে প্রার্থী নির্বাচন এবং নির্বাচনের রুপরেখা আমাদের সামনে না দেন তাহলে এই আসনগুলো উদ্ধার করা কঠিন হয়ে যাবে। তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধ করেন নির্বাচনের মাঠ দ্রুত গোছাতে কর্যকরি পদক্ষেপ নেয়ার।

তৃতীয় পর্ব: দেড় যুগেও সম্মেলন হয়নি রংপুরের জাপায়, কমিটি নেই বেশির ভাগ উপজেলা, ইউপিতে
রংপুরের এক সময়ের দাপুটে জাতীয় পার্টি ক্রমান্বয়ে জৌলুস হারাতে বসেছে। রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা, যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি না হওয়া এবং গ্রুপিং রাজনীতির ফলে দিন দিন ভেঙ্গে পড়েছে দলটির কাঠামো। রংপুরের তৃণমূল নেতাকর্মী এবং সাধারণ সমর্থকদের দাবী এখানে দীর্ঘ দেড় যুগেও সম্মেলন হয়নি। কমিটি নেই বেশির ভাগ উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদে। এতে রাজনৈতিক কর্মকান্ডহীন হয়ে জাতীয় পার্টি এখন প্রায় নেতা শুন্য হয়ে পড়েছে। গেলে উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলটির নিস্ক্রয়তার প্রতিফল দৃশ্যমান হয়েছে। ৮ উপজেলায় একজন চেয়ারম্যান আর তিনজন ভাইস চেয়ারম্যান ছাড়া কেউ জয় পায়নি। এছাড়াও ৭৬ ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৪-৫টিতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে। রংপুরের মত জায়গায় এমন ভরাডুবি বিগত কোন বছরে দলটির পরিসংখ্যানে দেখা যায় নি। কমিটি নবায়ন না করে মেয়াদ উত্তীর্ণদের নিয়ে দল চালানোর ফলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম সিদ্দিকী বলেন, প্রায় দেড়যুগধরে বন্ধ আছে রংপুরের সম্মেলন। প্রায় উপজেলাতে কমিটি নেই। মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটিও অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোতেও এসময়ের মধ্যে কোন কমিটি গঠন হয়নি। এর ফলে সংসদ নির্বাচনের মতই ভরাডুবি হয়েছে উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে।
রংপুরে আট উপজেলায় চেয়ারম্যান মাত্র একজন আর ভাইস চেয়ারম্যান তিনজন এই দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পীরগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান আবু নাসের শাহ মো: মাহবুবার রহমান। রংপুর সদরে দুই জন ভাইস চেয়ারম্যান যথাক্রমে মাসুদার রহমান মিলন এবং কাজলী বেগম। গঙ্গাচড়া উপজেলায় একজন ভাইস চেয়ারম্যান সাজু মিয়া। এছাড়া উপজেলাগুলোতে আর কোন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। সবচেয়ে খারাপ খবর হচ্ছে রংপুরের ৭৬টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৪-৫টি ইউপিতে জাতীয় পার্টি জয় পেয়েছে। আর বাকিগুলোতে পরাজয়ের স্বাদ পেতে হয়েছে দলটির সমর্থকদের।

স্থানীয় নির্বাচনে এমন পরাজয়ের পিছনে কারণ হিসেবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন কমিটি না থাকাকে দায়ী করছেন। কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর যখন কোন দলের নতুন কমিটি হয় না তখন সেই দলের সামগ্রিক পরিস্থিতি এমনটাই হবে এটাই স্বাভাবিক।
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা মনে করেন, নিজের দলের আত্মসমালোচনা না করলে দলের ভুলগুলো শুধরানো যাবে না। সত্যকথা বলতে মাঠপর্যায়ের জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা একেবারেই নাজুক। নতুন কমিটি নেই উপজেলাগুলোতে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোর অবস্থাও একই। দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম একেবাই ঝিমিয়ে পড়েছে। দায়ীত্বলরা তাদের নজর তৃণমূলের দিকে না দিয়ে উল্টো দিকে তাকাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন আমাদের শক্ত প্রতিনিধিত্ব না থাকায় অন্য দল চর দখলের মত জাতীয় পার্টির আসনগুলো দখল করে নিয়েছে। তিনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্যে বলেন, রংপুর ছাড়া বাইরের জেলার আসনগুলো নিয়ে কাজ করা আর মরু ভূমিতে পানি ঢালা সমান। রংপুরের আসনগুলোতে জোড়ালো পৃষ্টপোষকতা দিয়ে হারানো আসনগুলো ফিরে আনার উদ্যোগ নেয়ার আহবান জানান। এই নেতা মনে করেন রংপুর অঞ্চলের সাধারণ সমর্থকদের ভালোবাসা এখনো রয়েছে। নেতৃত্ব সংকট দূর করতে পারলে দলটির হারানো ইমেজ আবার ফিরে আনা সম্ভব।

এদিকে রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন দলের কার্যক্রমে কোন ভাটা পড়েনি। সব কিছু ভালোভাবেই চলছে। সাংগঠনিক কার্যক্রম থেমে নেই। সম্মেলনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবগুলো উপজেলা এবং ইউপিতে নতুন কমিটিও দেয়া হবে। তিনি মনে করেন, রংপুরের জাতীয় পার্টির অবস্থা এখনো ভালো আছে। জীবিত এরশাদের চেয়ে মৃত এরশাদ আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে দলের জন্য। সাধারণ মানুষের মনে এখনো লাঙ্গল প্রেম, এরশাদ প্রেম রয়েছে। তিনি মনে করেন দলটি আরো সংগঠিত হয়ে আগামী নির্বাচনে ভালো ফলাফল করবে।

মন্তব্য