কষ্ট, তবুও মুখে হাসি লতিফদের

প্রতীক ওমর

আব্দুল লতিফ। বয়স পয়তাল্লিশের এপার ওপার হবে। ফজরের আযানে নিত্য ভোরে ঘুম ভাঙ্গে তার। আড়মোড়া দিয়ে বিছানা ছাড়েন। দরজার খিল খুলে বাইরে পা বাড়ান। সোজা চলে যান গোয়াল ঘরে। আদরের গরু আর ছাগলগুলো ধীরে বাইরে বের করেন। ঘাস, খড় খেতে দেন। তারপর নিজেও চোখে মুখে পানি দিয়ে ঘুমের ঘোর কাটান। পান্তাভাত অথবা ঠান্ডাভাত খেয়ে দিনের শুরু করেন লতিফ। তারপর যমুনার বুকে জেগে ওঠা চরে চলে জীবন জীবিকার সংগ্রাম।
আগস্টের ২৩ তারিখ। চরের মানুষের খোঁজ-খবর নিতে বগুড়া শহর থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সারিয়াকান্দির প্রত্যন্ত এলাকার কয়েকটি চর ঘুরে সন্ধ্যা নামার আগে খেয়া ঘাটে ফিরছিলাম। কাঁধে ঘাসের বস্তা আর হাতে কাঁচি নিয়ে নৌকার অপেক্ষা করছিলেন আব্দুল লতিফ। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। রোদে পুড়ে অনেকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে শরীর। কাছে গিয়ে কুশলাদী জিজ্ঞেস করলাম। মুখ ভরা হাসি নিয়ে লতিফ বললেন ভালোই আছি। কতটা ভালো আছেন তার সাথে কিছুক্ষণের খোশ গল্পে সব উঠে আসে।


ভরা বর্ষায় ফসলের ক্ষেত, ঘর-বাড়ি পথ ঘাট সব কিছু পানির নিচে ডুবে যায়। নদী রক্ষা বাঁধপাড়েই আশ্রয় নিতে হয় বেশির ভাগ চরের মানুষকে। অনেকেই খোলা আকাশের নিচেই যাপন করতে হয় রাত। শিশু এবং বৃদ্ধ মানুষগুলো ওই সময় অসহায়বোধের চরম মাত্রায় পৌঁছে যায়। গৃহপালিত পশুর খাদ্য, শুকনা খাবার, জ্বালানি সব কিছুর অসহনীয় মাত্রায় সংকট পড়ে যায়।
আবার শুকনো মৌসুমে পথ ঘাটের অভাবে তপ্ত বালির পথ পাড়ি দিয়ে চলতে হয়। ধুধু চরের মধ্যে আবাদের জমিতে কাজ করতে হয়। কষ্টের ফসল কাধে, পিঠে করেই ঘর অথবা বাজার পর্যন্ত নিতে হয় কৃষকদের। অবর্ণনীয় কষ্ট। ছেলে মেয়েদের শিক্ষার জন্য ভালো প্রতিষ্ঠান নেই। বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে বাচ্চাদের লেখাপড়া করানো সবার পক্ষে পেরে ওঠা হয় না। অকালেই স্কুল থেকে ঝরে যায় হাজারো প্রতিভা। ইচ্ছে থাকা শর্তেও মেয়েরা দূরের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিতে যেতে পারে না। নিরাপত্তার পাশাপাশি ভেঙ্গেপড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা এর পিছনে বেশি দায়ী। আবার যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেরুদন্ডহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোতে লেখাপড়ার বালাই নেই। শিক্ষাকরা মনগড়ামত আসেন আবার সূর্য মাথার উপরে আসার আগেই প্রস্থান ঘটে তাদের। স্বাস্থ্যসেবার চিত্র আরো ভয়াবহ। আদিম যুগের মত চরের মানুষ এখনো মুমূর্ষু রুগিদের চৌকির উপর শুয়ে পালিকি বাহকের মত কাধে করে ডাক্তারখানায় নিতে হয়। চরগুলোতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার মত শক্তিশালী কোন চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। এতো কিছু অপ্রাপ্তির কথা একটানা বললেন আব্দুল লতিফ।
চরের মানুষের আয় কিভাবে আসে জানতে চাইলে লতিফ বলেন, ফসলই একমাত্র অর্থের জোগান দেয় চরবাসীদের। যাদের জমি আছে তারা আবাদ করেন আর যাদের জমি নেই তারা অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে কোন রকম পরিবার চালায়। এখন অবশ্য অনেকের ঘরে গরু আছে। গরু পালন করে সহজেই এখন চরের মানুষ টাকা আয় করছেন।


এদিকে লাগামহীন দ্রব্যমূলের গাতির কাছে অসহায় পরাজয় বরণ করেছেন এখানকার নিম্নআয়ের মানুষরা। আয় না বাড়া এবং কর্মহীনতা এক সাথে পৃষ্ট করছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ছিটে ফোটাও এসব অঞ্চলগুলোতে পড়তে দেখা যায় না। এনজিওদের ব্যবসার পন্য হিসেবে এসব চরের মানুষ প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হলেও এদের ভাগ্যের পরিবর্তন সহজে হয় না।
সারিয়াকান্দির স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ইমরান হোসেন রুবেল এবং জাহাঙ্গীর আলম মানবজমিনকে বলেন, ‘চরের মানুষের জন্মই হয় প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করার জন্য। যুদ্ধে কেউ টিকে থাকে আবার কেউ পড়ে যায়। দেশের শহরগুলোর জনপদ যেভাবে উন্নয়নের ছোঁয়ায় প্রতিনিয়তই রুপ পরিবর্তন হচ্ছে ঠিক তার বিপরীতে চর এবং প্রত্যন্তগ্রামগুলো ক্রমেই নিম্নমানের দিকে ধাবিত হচ্ছে’।
এখানকার চরের মানুষগুলো সৃষ্টিকর্তার সাহায্য নিয়ে নিজেরাই নিজেদের মত করে বেঁচে আছেন। হাজারো অপ্রাপ্তির মধ্যেও হাসিমুখে পথচলেন। নির্মল আর নির্মোহ প্রকৃতির সাথে সঙ্গ দিয়ে টিকে আছেন চরের হাজারো লতিফরা।

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *