‘চার আনার বাদাম সবাই মিলে ভাগ করে খেতাম’

প্রতীক ওমর: ‘কলেজের মাঠে একটি বড় বড়ই গাছ ছিলো। আমরা চার আনার বাদাম কিনে সেই বড়ই গাছের নিচে বসে বান্ধবীদের সাথে ভাগ করে খেতাম। গেটের সামনে কৃঞ্চচুড়া গাছের নিচেও আমাদের কলেজ সময় কাটতো। বহুবছর পর আজ প্রাণের ক্যাম্পাসে পা রেখেই সেই সব স্মৃতি মনের ভিতর নাড়া দিয়ে তুলছে। কলেজ পড়াকালীন বান্ধবীদের আজ এক সাথে কাছে পেয়ে আমাদের বয়স যেন সতেরোতে নেমেছে। আনন্দের সাথে আবার সমান তালে কষ্টও অনুভূব করছি। অনেক চেনামুখ আজ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে তাদেরকে আজ খুব খুব মনে পড়ছে’।
বগুড়ার সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজের ৬০ বছর পূর্তিতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায় আগত শেফালী হক, নূর আক্তার শোভা এবং নাজনীন শোকরানা তাদের অনুভূতি এভাবেই ব্যক্ত করেছেন। তারা সবাই ওই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী। স্বাধীনতার আগে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম পার্ট এবং স্বাধীনতার পরে দ্বিতীয় পার্টের পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেন তারা।


শনিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় ৬০০ সাবেক শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে যোগদেন। এসব শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই দেশের গুরুপূর্ণ দপ্তরে কর্মরত আছেন। কেউ আবার দাপ্তরিক দায়িত্বপালন শেষে অবসর যাপন করছেন। বয়সের ভাড়ে নূয়ে পড়া অনেক সাবেক শিক্ষার্থীদের দেখাও মেলে ওই আয়োজনে। ১৯৬৪ সালের প্রথম ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী মনোয়ারা হায়াত অনুষ্ঠানে যোগদেন। তিনি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মজিবুর রহমানের মেয়ে। সাদিকা নাছিম বানু নামের একজন সাকেব শিক্ষার্থীর সাথে কথা হয়। তিনি জানান, তার শ্বাশুড়ীও ওই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। অনুষ্ঠানে তিনি শ্বাশুড়িকে সাথে নিয়ে এসেছেন।


নাছরিন পান্না ১৯৯১ সালে এইচএসসির ব্যাচের শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিন পর প্রাণের ক্যাস্পাসে এসে তিনি হারিয়ে যান স্মৃতিময় অতিতে। বয়স ৫১ হলেও তিনি আজ নেমে যান ২২ বছরে। সব বান্ধবীদের নিয়ে হৈ হুল্লর আর নাচগনে মেতে ওঠেন। তহমিনা পারভীন শ্যামলীর এই কলেজে এক সময় নিত্য পদচারণা ছিলো। দীর্ঘদিন পরে তিনিও মিলনমেলায় অংশ নিয়েছেন। আনন্দে পুরোটা সময় উপভোগ করেন তিনি।


কথা হয় আরফিন আরা বেগম নাজের সাথে। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজের ১৯৭৯-৮০ সালের এইচএসসির ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার আরো তিন বোন ওই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তারাও এই আয়োজনে উপস্থিত আছেন। তিনি বলেন, আজ আমার সবচেয়ে বেশি আনন্দের দিন এই জন্য যে, আমি যে কলেজে পড়ালেখা করেছি সেই কলেজের বয়স আজ ৬০ বছর আমার নিজের বয়সও ৬০ বছর। বিশেষ এই মহুত্বে এই আয়োজনে উপস্থিত হতে পেরে গর্বিত মনে করছি।


সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর জোহরা ওয়াহিদা রহমান নিজেও এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার একান্ত প্রচেষ্টায় আজকের এই আয়োজন। তিনি মূলত দায়িত্ব নেয়ার পরেই কলেজের ৬০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে সাবেক শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা আয়োজনের চিন্তা করেন। র্দীঘ প্রায় ৬ মাসের প্রচেষ্ঠায় অনুষ্ঠানটি সফলতার মুখ দেখে। প্রফেসর জোহরা ওয়াহিদা রহমান মানবজমিনকে তার অনূভূতি ব্যক্ত করেন ঠিক এভাবেই ‘ আমি নিজে এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম। এখন কলেজের অধ্যক্ষ। এই অনুভূতি মুখে বলে প্রকাশ করার মত নয়। আজকের এই মিলনমেলা আমাদের হৃদয়ের একটি শক্ত বন্ধন। আমরা প্রতিবছর এভাবেই সবাই একত্রিত হয়ে উপভোগ করতে চাই আমাদের অতিতের স্মৃতিগুলো।


সরকারি মুজিবুর রহমান কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জোহরা ওয়াহিদা রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, বগুড়া-৬ সদর আসনের সাংসদ রাগেবুল আহসান রিপু, বরেণ্য অতিথি ছিলেন, সরকারি মুজিবুর রহমান কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর হাবিবা বেগম। বিশেষ অতিথি ছিলেন, অর্থ মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্তি সচিব ও সাবেক শিক্ষার্থী আরফিন আরা বেগম নাজ, ভান্ডারী সিটি লিমিটেডের চেয়ারম্যান তৌফিকুর রহমান বাপ্পী ভান্ডারী, সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ, প্রফেসর ড. বেলাল হোসেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন, সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক গোলজার হোসেন। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন বাংলা বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক দেবদুলাল দাস। সকালে বেলুন ও কবুতর উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন অতিথিবৃন্দ।

 

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *