তালিকায় নেই গোস্ত, দুধ, সখের খাবার/ পারিবারিক বাজেটে ঘাটতি, টেনশন মধ্যবিত্ত কর্তাদের

প্রতীক ওমর: রইছ উদ্দিন (ছদ্দনাম)। পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৪জন। স্ত্রী আর ছেলে মেয়ে। পেশায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। প্রধান কর্তা হিসেবে মাসের শুরুতেই পারিবারিক বাজেট অধিবেশন ডাকেন তিনি। চার সদস্যদের সংসদে মাসের আয় ব্যয়ের হিসাব নিকাষ হয়। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার রইছ উদ্দিনের। বাজেট বৈঠকে খরচের তালিকা কষেন স্ত্রী রুবাইয়া। তারপর তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যায়নরত মেয়ে তাবাসসুম ফর্দি পাঠ করে শোনায় অধিবেশনে। ছোট ছেলে নার্সারি পড়ুয়া আবরার কিছুই বোঝে না। শুধু তার স্কুলের বেতন লেখা হয়েছে তাতেই খুশি। অধিবেশন চলছে। ব্যয়ের তালিকা পাঠ শেষে ব্লাড প্রেসার মহুত্বেই বেড়ে যায় রইছ উদ্দিনের। চাকরির বেতন ১৫ হাজার টাকা। মাসিক ব্যায় ৩৪ হাজার ২৫৭ টাকা। ঘাটতি ১৯ হাজার ২৫৭ টাকা। ব্যয়ের সেই তালিকায় নেই গোস্ত, দুধ, সখের খাবার।

রইছ উদ্দিনের পারিবারিক বাজেটে অবশ্যিক ব্যয়গুলো হচ্ছে-বাসা ভাড়া ৮০০০ টাকা। ভবনের সার্ভিস চার্জ ১৩০০ টাকা। ময়লার বিল ১০০ টাকা। ডিস বিল ৩০০ টাকা। গ্যাস বিল ১০৫০ টাকা। বিদ্যুৎ বিল ১০০০টাকা। দুই বাচ্চার স্কুল এবং কোচিং বেতন ৪০০০ টাকা। স্কুলে যাতায়াত রিক্সাভাড়া ৪০০০ টাকা। চাল ৩০ কেজি ১৬৫০ টাকা। আলু ৮ কেজি ৪০০ টাকা। কাচামরিচ ৩ কেজি ৬০০ টাকা। পেয়াজ ৪ কেজি ৪০০ টাকা। আদা রসুন ৩০০ টাকা। অন্যান্য কাচামাল ১৫০০ টাকা। সয়াবিন তেল ৩ লিটার ৪৯২ টাকা। সরিষার তেল ৫০০ মিলি ১১০ টাকা। মসুর ডাল ৩ কেজি ৩০০ টাকা। চিনি ২ কেজি ২৭০, লবন ৩ কেজি ১২০ টাকা। ডিম ১২০০ টাকা। মাছ ২৫০০ টাকা। মসলা ২০০ টাকা। নারিকেল তেল ৫০০ মিলি ৩৩০ টাকা। কাপড়কাঁচা সাবান ৩ পিস ৭৫ টাকা। গোসলের সাবান ৩ পিস ১৪০ টাকা। ডিটারজেন পাউডার ১ কেজি ৮০ টাকা। হারপিক ৫০০ মিলি ১০৫ টাকা। হ্যান্ড ওয়াস ১৭০ মিলি ৭৫ টাকা, তুথপেস্ট ১৪৫ গ্রাম ১১০ টাকা, সেলুন বিল দুইজনের ৬০০ টাকা। বাইকের তেল ১৫০০ টাকা। ওষুধ ৫০০ টাকা। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রি ১৫০ টাকা। মোবাইল ইন্টারনেট বিল ৮০০ টাকা।

উল্লেখিত খরচগুলো রইছ উদ্দিনকে কোন না কোনভাবে করতেই হয়। আয়ের থেকে ব্যয় দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় পুরো মাসজুড়েই বাড়তি টেনশন পোহাতে হয় তাকে। সংসার চালাতে ব্যয় মিটাতে প্রতি মাসেই ঋণগ্রস্থ হতে হচ্ছে রইছকে। ফলে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চল্লিশ বছরেই বৃদ্ধ হতে চলছে শরীরের অবয়ব।

ক্রমান্বয়ের নিত্যপণ্যের বাজার রইছ উদ্দিনের মত কোটি কোটি নিম্নমধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে চলে গেছে অনেক আগেই। বাজারে চোখের পানি ঝড়াতে দেখা যায় অকেককে। রাতারাতি ইচ্ছেমত দাম বৃদ্ধি করছেন ব্যবসায়ীরা। রাষ্ট্র কোনভাবেই তার নাগরিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। নাভিশ্বাসে প্রাণ উষ্ঠাগতপ্রাণ। নিরুপায় সাধারণ মানুষ। তাদের আপাতত কিছুই করার নেই চলমান বাজার পরিস্থিতিতে।
সরজমিন প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম, চরের মানুষদের খোঁজ নিতে গেলে আরো ভয়াবহ চিত্র চোখের সামনে উপস্থিত হয়। লাখ লাখ পরিবার আছে যারা কেবল ভাত ভর্তাতেই জীবন পাড় করছেন। মাংস জোটে কুরবানি ঈদে।

চরের মানুষগুলোর বেশিরভাগ রাষ্ট্রিয় মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বরাবরেই বঞ্চিত হয়ে আছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলা। বেশির ভাগ অংশ যমুনা নদীর অববাহিকায়। নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা চরগুলোতে লাখ লাখ মানুষের বাস। প্রতিদিন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে জীবন যুদ্ধ করছে তারা। এমন একটি গ্রামের নাম বানিয়ারপাড়া। সেখানকার বাসিন্দারে সাথে কথা বলে জানাযায় তাদের দুর্দশার কথা। শিক্ষা, স্বাস্থ্যে অবস্থা করুণ। খাদ্য এবং বাসস্থান উভয়ই কোন রকম জীবন চলে যাওয়ার মত। ভাত ভর্তা আর শাক-সবজি খেয়েই জীবন ধারণ করেন তারা। মাংস জোটে কুরবানির ঈদে। নদীর পশ্চিমপাড়ের সামর্থবান বাসিন্দাদের পাঠানো মাংসে ওই সময় দুই এক বেলা খাওয়া হয়। এছাড়া মৌসুমী ফলের দেখা পায় না বেশির ভাগ চরের মানুষ। কখন কোন ফলের মৌসুম আসে যায় তারা টেরই পায় না। চরে ফলের গাছ কম থাকায় এবং অর্থের অভাবে শহর থেকে ফল কিনে খাওয়ার সামর্থ নেই অনেকের। ফলে বছরে একবারও তাদের পেটে ফলের রস পড়ে না।

পুষ্টির অভাবে মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে শিশুরা। শিক্ষা কার্যক্রম থেকেও এসব শিশুরা ঝরে পড়ছে পুষ্টির অভাবে। কথা হয় বানিয়ারপাড়ার কল্পনা বেগম, কমলা বেগম, জোসনা খাতুন, মিলি বেগম, সূর্য বেগম এবং সম্রাটের সাথে। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় কি থাকে জানতে চাইলে বেশির ভাগ উত্তর আসে ভাত ভর্তার সাথে শাক সবজি। যারা মুরগি পালে তাদের কপালে মাঝেমধ্যে ডিম জোটে। বর্তমানে ডিমের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় না খেয়ে টাকার প্রয়োজনে বিক্রি করে থাকেন। শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার জোগান দেয়ার সামর্থ নেই প্রায় মানুষের। জন্মের পর মায়ের বুকের দুধও পায় না অনেক শিশু। কারণ মায়েদেরও পুষ্টির অভাব চরমভাবে লক্ষণীয়। এসব শিশুদের ভাতের মার, আটা ময়দা গুলে খাওয়ানো হয়। ফলে শারীরীকভাবে র্দ্বুল হয়ে বেড়ে ওঠে। স্কুলের পড়ালেখাও মাথায় সহজে ঢোকেনা। একারণেই চরের শিশুরা প্রাথমিকেই শিক্ষা জীবন থেকে সড়ে পরে।
চরের এসব মানুষদের ভাস্যমতে নিজেদের উৎপাদিত ফল ফসল ছাড়া অন্য কিছু নিনে খাওয়ার সামার্থ নেই অনেকের। আপেল, কমলা, খেজুর, আঙ্গুর সহজে পাওয়া যায় না চরগুলোতে। ক্রেতার অভাবে ব্যবসায়ীরাও এসব রাখেনা দোকানে। তবে আম কাঠাল কলা স্থানীয়ভাবেই কিছুটা হয়। ফলে এসব ফল মৌসুমে খেতে পারে তারা।

লাগামহীন দ্রব্যমূলের কাছে চরের এসব নিম্নআয়ের মানুষরা অনেকটা পরাজয় বরণ করেছেন। আয় না বাড়া এবং কর্মহীনতা এক সাথে পৃষ্ট করছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এসব মানুষদের। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ছিটে ফোটাও এসব অঞ্চলগুলোতে পড়তে দেখা যায় না। প্রত্যন্তগ্রামগুলোর মানুষ ক্রমেই মহা সমস্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে। চলমান পরিস্থিতিতে ক্ষুধা নিবাররণ করাই দায় হয়ে পড়েছে অনেকের কাছে।

 

 

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *