পিতার শহরে পুত্রের স্বপ্ন, অত:পর…

প্রতীক ওমর

ত্রিশ পয়ত্রিশ বছরের টগবগে যুবক। তারুণ্যের সবটুকু দিয়ে দেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ণের মহাপরিকল্পনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী একেএকে স্বপ্নগুলো দৃশ্যমান করার ছক নিজের মধ্যে পুষে রেখেছেন। ঘনিষ্ট বন্ধুদের সাথে চায়ের আড্ডায় তার গোপন ভাবনাগুলো শেয়ার করতেন। পিতার জন্মভূমিকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করতে আদালা ভালোবাসা বাসাবাঁধে তার বুকে। নিদ্রাহীন স্বপ্ন চোখজুড়ে। বাস্তবায়ণের অবাধ সুযোগ আছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঝপিয়ে পড়েন কাজে। স্বপ্নবাজ সেই তরুণ আরাফাত রহমান কোকো। দুই হাজার দুই তিন সালের কথা। মা বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। দেশকে এগিয়ে নেয়ার হ্যান্ডেল তখন মায়ের হাতে। বড় ভাই তারেক রহমান মায়ের পাশে সামগ্রিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামান। সময় দেন। পরিশ্রম করেন। কোকোর স্বপ্ন খেলার জগতকে এগিয়ে নেয়া।
উত্তরের গেটওয়ে বগুড়া। কোকোর স্বপ্নের শহর। ভালোবাসার শহর। পিতা শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজরিত শহর। এই শহরের অলিগলিতে তার পিতার পায়ের ছাপ লেগে আছে। এই অঞ্চলের আপামর মানুষের হৃদয় কোঠরে বসার আসন ছিলো মহান মানুষটির। এতো ভালোবাসা কোন মানুষ মানুষের কাছে পেতে পারে জিয়াউর রহমান তার অন্যতম উদাহরণ। কোকোর দৃষ্টিজুড়ে কেবল পিতার সেই শহর। নিজে তরুণ। সংগত কারলেই তরুণদের নিয়েই বেশি ভাবনা ছিলো তার। বগুড়ার ক্রীড়াঙ্গণকে এগিয়ে নেয়া। বগুড়া শহরের খান্দারে অবস্থিত শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামের মূল্য গেইটে প্রবেশ করে ডান দিকে তাকালেই চোখে পড়ে মার্বেল পাথরে খোদাই করা নেমপ্লেট। শহীদ চাঁন্দু ক্রীড়া কমপ্লেক্সে। ফলকটি ২০০৩ সালের ৩জুন উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বগুড়াকে ক্রীড়াঙ্গনের ‘সেকেন্ডহোম’ বানাতে চেয়েছিলেন আরাফাত রহমান কোকো। এই ক্রীড়া কমপ্লেক্সটি ছিল সেই স্বপ্ন পূরণের মূল সুঁতিকাগার। তৎকালীন সরকারে থাকা বগুড়ার উন্নয়নবিরোধী একটি গ্রুপের বাধার কারণে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি কোকো। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই যুগ। মার্বেল পাথরের সেই ফলক এখনো জ্বলজ্বল করলেও ক্রীড়া কমপ্লেক্সের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করেনি।
তখন আমরা সবে কলেজে পা রেখেছি। ছোট মানুষ। খেলা-ধূলার প্লেয়ার না হলেও ভালো দর্শক ছিলাম। যেকোন খেলা উপভোগ করতাম। আরাফাত রহমান কোকো মাঝে মধ্যেই বগুড়ায় আসতেন। ক্রীড়া কমপ্লেক্স করবেন। ক্রিকেটকে এগিয়ে নেয়ার কাজ করবেন। এসব দূর থেকে শুনতাম। কখনো কখনো কাছে থেকেও তার পদচারণা দেখার সুযোগ হয়েছে। বগুড়ার খেলোয়ার এবং খেলাপ্রেমীদের মনের মধ্যে উৎফুল্লতা দেখেছি। কোকো বগুড়াকে উত্তরাঞ্চলে ক্রীড়ার রাজধানী করতে চেয়েছিলেন। বগুড়া থেকেই জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়ার তৈরির ইচ্ছে ছিল তার। এলক্ষ্যে ২০০২ সালে শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামের আধুনিকায়ন করা হয়। পরবর্তীতে আইসিসি এই স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক ভেন্যুর মর্যাদা দেয়। পরে ওয়ানডে এবং টেস্ট ম্যাচ আয়োজন করা হয় ওই স্টেডিয়ামে। তার হাতধরেই ২০০৪ সালের অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয় এই মাঠে। শুধু স্টেডিয়াম নয়, ওই স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করে আধুনিক ক্রীড়া কমপ্লেক্স তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন কোকো। শুধু ক্রিকেট নয়, সবধরণের খেলাধুলার আয়োজন এক জায়গায় করতে চেয়েছিলেন।
তার ক্রীড়া কমপ্লেক্সের পরিকল্পনায় ছিল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশে একটি আধুনিক ফুটবল স্টেডিয়াম, আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন জিম, সর্বাধুনিক সুইমিংপুল, এ্যাথলেটিকসের জন্য আলাদা মাঠ, ভলিবল মাঠ, বাস্কেটবল গ্রাউন্ড এবং শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের ফাঁকা জায়গায় আবাসিক হোটেল। স্টেডিয়ামের পাশের কৃষি খামারের কিছু অংশ নিয়ে সেখানে ফুটবল স্টেডিয়াম এবং এ্যাথলেটিক্সের জন্য ট্র্যাক নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী এম কে আনোয়ার বিরোধীতা করায় সেটা আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

আরাফাত রহমান কোকো শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করে আলাদা একটি ক্রীড়া জগত গড়তে চেয়েছিলেন। ওভার ব্রীজের মাধ্যমে এক স্টেডিয়াম থেকে আরেক স্টেডিয়ামে এবং সুইমিংপুলে সংযোগ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন খেলোয়াড়দের নিজস্ব আবাসিক হোটেল তৈরি করতে। যেখানে থেকে খেলোয়াররা দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণ নিতে পারতেন। তিনি বগুড়ায় একটি আধুনিক ক্রিকেট একাডেমিও করতে চেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার তৈরির জন্য শ্রীলংকান কিউরেটর নন্দসেনাকে দিয়ে স্টেডিয়ামে দুটি বাউন্সি উইকেট তৈরি করেছিলেন। যা দেশের অন্যকোন ভেন্যুতে ছিল না। সেই বাউন্সি উইকেটে অনুশীলন করেই বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এখনো সেই উইকেটগুলো দেশের সেরা বাউন্সি উইকেট হিসেবে বিবেচিত।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, ক্রিকেট এবং ফুটবলে উত্তরাঞ্চলে প্রচুর সম্ভাবনা আগে থেকেই রয়েছে। আরাফাত রহমান কোকোর পরিকল্পনাগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে বগুড়া থেকে জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় সরবরাহ করা যেত। বিশেষ করে একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স তৈরি হলে এই অঞ্চলের ক্রীড়ায় ব্যাপক উন্নয়ন করা সম্ভব হতো।
ক্রীড়া সাংবাদিক মোস্তফা মোঘল বলেন, রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথেই বদলে গেছে বগুড়ার ক্রীড়াঙ্গনের চেহারা। অতীতের সব সাফল্য, অবদান ভুলে গেছেন বর্তমানের কর্তারা। যেই নির্লোভ মানুষটি শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামকে সারা দুনিয়ায় পরিচিত করে তুলেছিলেন সেই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর দিনেও তাঁকে স্মরণ করেনা কেউ। শুধু তাই নয়; একসময় যারা শহীদ জিয়ার নামে ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে বগুড়ার ক্রীড়াঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাও কখনো এই দিনটি স্মরণ করেনা! রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন সুবিধাভোগী ক্রীড়া সংগঠকরা। ফলে একজন কীর্তিমান ক্রমেই স্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছেন। মুছে ফেলা হচ্ছে তার পরিকল্পনাগুলোকেও। নতুন প্রজন্ম জানার সুযোগই পাচ্ছেনা মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর অবদানগুলো।
আরাফাত রহমান কোকোর আজ মৃত্যু দিবস। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট জন্ম নেয়া মহান মানুষটি মাত্র ৪৫ বছর বয়সে ২০১৫ সালের এইদিনে মৃত্যুর কারণ। মৃত্যুর পূর্বে তিনি বতর্মান ক্ষমতাশীন দলের হাতে চরমভাবে নির্যাতনের শিকার হন। মামলা এবং শারীরীক নির্যতনের ধকল পরবর্তীতে সামলে উঠতে পারেননি।
আরাফাত রহমান কোকো ২০০২-২০০৫ সনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। এই সময় বিসিবির গেমস ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। এছাড়া ক্রীড়া সংঘ ওল্ড ডিওএইচ এর চেয়ারম্যান ছিলেন। যুক্ত ছিলেন সিটি ক্লাবের সাথেও। শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম মিরপুর ও বগুড়া শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের রূপকার তিনি।
সেই স্বপ্নবাজ তরুণের অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তীতে আর কেউ এগিয়ে আসেনি। দেশের রাজনৈতিক আকাশে কালো মেঘের পাহার জমতে থাকে। দীর্ঘ হতে থাকে অন্ধকার। রাত আসে। সেই রাত আর পোহায় না। অন্ধকারেই ঢাকা পড়ে স্বপ্নবাজ তরুণটির স্বপ্নগুলো।
তবে অনেকের মনের মধ্যে পুষে রাখা আক্ষেপগুলো হয়তো সুবিধাজনক সময়ে বিস্ফোরণ হবে। তখন হয়তো ক্রীড়াঙ্গণে নিবেদীত এই মানুষটির স্বপ্নগুলোয় রঙ লাগবে। সেই অপেক্ষায় পজেটিভ মানুষেদের আপাতত চেয়ে থাকা।

 

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *