‘প্রান্তিকজনপদ থেকে নাগরিক কবি প্রতীক ওমর’

প্রান্তিকজনপদের একটি নিভূতগ্রাম। যেখানে সকালের সূর্য উঠতো কৃষকের লাঙ্গলের ফলায় ঝিলিক দিয়ে। চার দিকে সবুজের মাঠ। আম কাঠালের ছায়াবীথি মেঠোপথজুড়ে বিছানো। বট পাকুরের বন্ধনে একাকার। পাখির কলতাল। শরতে বিলের শান্তপানি নীলবরণ ধারণ করতো। শালুক ফুল সেখানে শোভা পেতো মৌসুমজুড়ে। এমন একটি প্রাণবন্ত গ্রামের নাম মথরপাড়া। গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার তেনাচিরা বিল ঘেসে গ্রামটি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ওই গ্রামেই একটি সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৮৫ সালে ১১ অক্টোবর জন্মগ্রহন করেন ওমর ফারুক (লেখক নাম প্রতীক ওমর)। পিতা আব্দুস সালাম এবং মাতা মনোয়ারা বেগম। তিন ভাই আর দুই বোনের মধ্যে তার অবস্থান দ্বিতীয়। পিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক ছিলেন। নিষ্ঠার সাথে তিনি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। পেশাগত দায়িত্বপালনকালীন তার খাতায় কখনো লাল দাগ ছিলো না। জীবনের শেষ সময়ের দিকে তিনি ডায়াবেটিকের কারণে শারীরীকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি নিয়মিত স্কুলে গিয়েছেন। এলাকায় তার সুনাম সুখ্যাতি আজো ছড়িয়ে আছে। ২০০৮ সালে তিনি পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছেন। মা বরাবরেই একজন সু-গৃহিনী। তিনি এখনো সুস্থ আছেন।

 

প্রতীক ওমর প্রাথমিক শিক্ষার সময় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেছেন। গ্রামের নামেই একটি দাখিল মাদ্রাসায় কিছু দিন প্রাথমিকে পড়াশোনা করেছেন। ওই মাদ্রার অধ্যক্ষ ছিলেন তার বড় জ্যেঠা মাওলানা মোজাফ্ফর হোসেন। তারপর কমলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যায়লে। তখন তার পিতা ওই প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। পিতার হাত ধরেই তখন ওই স্কুলে ৪র্থ এবং পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। এরপর ছিলমানের পাড়া এস ইউ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আবারো পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখানে দুই বছর পড়ালেখার পর আবার ভর্তি হন বোনারপাড়া এম ইউ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায়। সেখানে সপ্তম এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার পর চলে যান উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা মহিমাগঞ্জ আলিয়া কামিল মাদ্রাসায়। সেখানে ১৯৯৯ সালে বিজ্ঞান বিষয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। পরে আলিম বিজ্ঞান বিষয়ে পাস করার পর তিনি উত্তরবঙ্গের আরেক অন্যতম বিদ্যাপীঠ সরকারি আজিজুল হক বিশ^বিদ্যায় কলেজ থেকে ২০০৯ সালে বাংলা বিষয়ে সম্মান এবং ২০১০ সালে ¯œাকত্তোর ডিগ্রী লাভ করেন।

লেখালেখি শুরুর অনুপ্রেরণা: প্রতীক ওমরের মামা জাহিদুল ইসলাম। পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি খুব বই পড়ুয়া মানুষ। ছোটবেলায় স্কুল বন্ধ হলে যখন নানা বাড়িতে লম্বা সময়ের জন্য বেরাতে যেতেন। তখন মামার টেবিলে স্তুপকরা বইগুলো হাতে নিয়ে নাড়াচারা করতেন। অনেক নামিদামী সাহিত্য ম্যাগাজিনও ওই টেবিলে থাকতো। তারমধ্যে ঢাকা ডাইজেস্ট, মাসিক পৃথিবী, মাসিক মদিনা, কিশোরকণ্ঠসহ আরো বেশ কিছু ম্যাগাজিন তার মামা নিয়মিত কিনতেন। এগুলো ম্যাগাজিন পাঠে একসময় প্রতীক ওমরও নিয়মিত হয়ে ওঠেন। এসব ম্যাগাজিন পাঠের সূত্র থেকেই ছড়া লেখার অনুপ্রেরণা মাথায় জেকে বসে।
৬ষ্ঠ কি সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন প্রথম ছড়া লেখা শুরু। তখনও নিজগ্রামেই থাকতেন তিনি। বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক সাতমাথা, দৈনিক আজও আগামীকাল, উত্তরবর্তা, করতোয়াসহ বেশ কিছু পত্রিকা তখন নিয়মিত সাপ্তাহিক সাহিত্যপাতা বের করতো। গ্রাম থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার বাইসাইকেল চালিয়ে বোনারপাড়া গিয়ে এসব পত্রিকা সংগ্রহ করেন তিনি। এক সময় একজন হকারের সাথে কথা বলে নিজগ্রাম পর্যন্ত পত্রিকা আনার উদ্যোগ নেন। তার মাধ্যমেই ওই অজোপাড়াগ্রায়ে প্রথম পত্রিকা প্রবেশ করে। এসব সাহিত্য পাতায় প্রথমে ওই হকারের মাধ্যমে ছড়া পাঠাতেন তিনি। অনেক দিন পাঠালেও একটি ছড়াও ছাপা হয়নি। পরে একদিন দৈনিক আজও আগামীকাল পত্রিকার বোনারপাড়া প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান বুলেন এর সাথে পরিচয় হয়। তাকে তিনি ছড়া লেখার বিষয়টি জানান। সাংবাদিক বুলেন ছড়া ছাপানোর ব্যবস্থা করবেন বলে আশ^াস দেন। প্রথম ওই সাংবাদিকের মাধ্যমেই দৈনিক আজ ও আগামীকাল পত্রিকায় ছড়া ছাপা হয়। এরপর দৈনিক সাতমাথা পত্রিকার ফুলকলিদের মেলা, দৈনিক করতোয়ার সবুজ আসর, দৈনিক উত্তরবার্তার সাহিত্য পাতায়, দৈনিক দুর্যয় বাংলার সাহিত্য পাতা, রংপুরের যুগের আলো, গাইবান্ধার দৈনিক পলাশ, দৈনিক ঘাঘট পত্রিকাসহ আঞ্চিলিক পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত লেখা ছাপা হতো। ওই সময় অর্থাৎ ১৯৯৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সাহিত্য চর্চা কেন্দ্রী বেশ কিছু সংগঠনে কাজ করেন তিনি। ‘সোচ্চার সাহিত্য সাংস্কৃতি সংসদ’ নামে বোনারপাড়ায় একটি সাহিত্য সংগঠন ছিলো। ওই সংগঠনের স্বক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন তিনি। মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূরের সম্পাদনায় সোচ্চার নামে ২০০১ সালে একটি সাহিত্য ম্যাগাজিনও ওই সময় প্রকাশ হয়েছিলো। সেখানে প্রতীক ওমর সহকারি সম্পাদকের দায়িত্বপালন করেন। এরপর বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরে এলাকা ছাড়ে বগুড়ায় চলে আসেন ২০০৪ সালে। বগুড়ায় আসার বছর দুয়েক পরে ২০০৬ সালে ছড়া বিষয়ক লিটলম্যাগাজিন ‘চমচম’ প্রকাশ করেন তার সম্পাদনায়। দেশের এবং দেশের বাইরের নামকরা ছড়াকাররা ওই ‘চমচমে’ নিয়মিত লিখতেন। এর পাশাপাশি ২০০৭ সালে শিল্পসাহিত্যের ছোটকাগজ ‘চিলেকোঠা’ সম্পাদনা করেন। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে ‘চিলেকোঠা’ নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে। সম্পাদনায় আসার সময় তিনি তার নাম পরিবর্তন করে ওমর ফারুক থেকে প্রতীক ওমর নামে লেখালেখি এবং সম্পাদনা শুরু করেন। ছড়া নিয়ে বেশি দূর না এগুলেও কবিতায় তিনি বেশ ঝড় তুলেছেন। ২০১৬ সালে সমসাময়িক পরিপ্রেক্ষিত বিষয়বস্তুর উপর ভিক্তি করে লেখা কবিতার সমন্বয়ে প্রথম কাব্য ‘পেরেকবিদ্ধ সময়’ প্রকাশ হয়। এরপর দ্বিতীয় কাব্য ‘পড়ন্ত বিকেলের কাছে’ প্রকাশ হয় ২০২০ সালে। তার লেখা কবিতার বই দুটি বেশ পাঠক প্রিয় হয়ে উঠেছে।

প্রতীক ওমর পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই বেছে নিয়েছেন। লেখা প্রথম সংবাদ ১৯৯৭ সালে দৈনিক সাতমাথায় প্রকাশ হয়। তখন তিনি সবেমাত্র সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারপর থেকেই বগুড়ার দৈনিক সাতমাথা পত্রিকা দিয়ে শুরু হয় সাংবাদিকতা। এরপর কিছু দিন কাজ করেছেন দৈনিক উত্তরকোণ পত্রিকায়। এরপর ২০১০ সালে ঢাকায় চলে যান। সেখানে তিনি দেশের এক মাত্র ‘সাপ্তাহিত ২০০০’ পত্রিকায় কন্টিবিউটার হিসেবে কাজ করেন বছরখানেক। এরপর ২০১৩ সালে আবার বগুড়ায় ফিরে আসেন তিনি। বগুড়ায় আসার পর প্রতীক ওমর জাতীয় দৈনিক অর্থনীতি প্রতিদিনে কাজ শুরু করেন। পত্রিকাটি এক সময় বন্ধ হয়ে গেলে তিনি অন্য আরেকটি জাতীয় পত্রিকা সংবাদ প্রতিদিনে যোগ দেন। সেখানে দায়িত্বপালন কালে দৈনিক মানবজমিনে কাজের সুযোগ পেয়ে যান তিনি। ২০১৬ সাল থেকে বর্তমান ২০২২ সাল চলাকালীন অব্দি তিনি দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় কর্মরত আছেন। অপর দিকে ২০১৮ সালের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্য ‘ভয়েস অফ আমেরিকা’র উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। সেখানেও তিনি আজ অব্দি সু-নামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।

কবিতা চর্চা, সম্পাদনা এবং সাংবাদিকতা এক সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কঠোর অধ্যাবসায় আর পরিশ্রমকে তিনি ভালোবাসেন। সময় পেলেই ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন তিনি। দেশের প্রায় সবগুলো জেলাতেই তিনি পেশাগত কাজের সুবাদে ঘুরে বেরিয়েছেন। পাশর্^কর্তী দেশ ভারতেও তিনি ভ্রমণ করেছেন ২০১৯ সালে। নানা বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা তার সঞ্জলে আছে। সুস্থ্যধারার সাহিত্য বিনির্মানে তিনি বদ্ধপরিকর।

০৪.০১.২০২২
প্রতীত ওমর, বগুড়া
০১৭১৭৮৫২৬৮২

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *