প্রতীক ওমর
ভগ্নিপতির বাড়ি ঝিনাইদহে। তিনি একজন ফুল কারবারি। চাষও করেন। তার দেখে উদ্বুদ্ধ হন বগুড়ার শহিদুল। কয়েক বছর আগে নিয়মিত ফসল চাষ বাদ দিয়ে শুরু করেন ফুলচাষ। অনার্স পড়ুয়া ছেলে আখতারুজ্জামান সবুজ শহিদুলকে সার্বিক সহযোগিতা করছেন। এখন তাদের সাত বিঘা জমির ফুল থেকে মাসে আয় গড়ে সত্তর হাজার টাকা। শহিদুলের জমির ফুল দিয়েই বগুড়ার বাজার চাহিদা অনেকটা পুরণ হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
সরজমিন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গোহাইল ইউনিয়নের বেড়াগাড়ী গ্রামে গিয়ে দেখা মেলে তার জমিতে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা নানাজাতের ফুল। বর্তমানে চন্দ্রমল্লিকা হলুদ এবং সাদাজাতের ফুল জমিতে শোভা পাচ্ছে। রজনীগন্ধ এবং গোলাপের পাপড়িগুলো কেবল উকি দিচ্ছি। কয়েদিন পর সেগুলোও পূর্ণতা পাবে। জাতীয় দিবসগুলোকে কেন্দ্রকরে দেশের সব জায়গায় ফুলের চাহিদা বেড়ে যায়। গেলো বিজয় দিবসেও মোটা টাকার ফুল বিক্রি করেছেন শহিদুল। জাতীয় দিবসগুলো ছাড়াও এখন প্রায় অনুষ্ঠানে ফুলের ব্যবহার বেড়েছে। সংগত কারণেই সারা বছর ফুলের চাহিদা থাকে।
কথা হয় শহিদুলের সাথে তিনি বলেন, আগে সবজি চাষ করতেন তিনি। কখনো লাভ হয়েছে আবার কখনো লোকশান গুনেছেন। ভগ্নিপতির ফুলচাষ দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ছেলেকে সাথে নিয়ে শুরু করেন ফুলচাষ। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে বদলাতে সক্ষম হন। এখন তার আবাদের ফুল দিয়েই বগুড়ার চহিদা পুরণ হচ্ছে। তিনি জানান, বগুড়া ছাড়াও পাশের জেলা জয়পুরহাট, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধাতেও নিয়মিত তার ফুল যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকার ফুল ব্যবসায়ীরাও মাঝেমধ্যে শহিদুলের ফুল নিতে আসেন।

শহিদুলের ছেলে আখতারুজ্জামন সবুজ বলেন, ফুল চাষে আমাদের কোন প্রশিক্ষণ নেই। চাষে কোন সমস্যায় পড়লে ঝিনাইদহে ফোন দিয়ে সমাধান নিতে হয়। স্থানীয় কৃষি বিভাগ কোন দিন তাদের জমিতে আসেনি। কোন সমস্যা নিয়ে কর্মকর্তাদের কাছে গেলে তারা ইউটিউব দেখে সমাধান বের করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ফলে আর কোন দিন তাদের কাছে যাইনি। সবুজ বলেন, কৃষি বিভাগ যদি আমাদের পাশে থাকতো তাহলে আমাদের এই উদ্যোগকে আরো বহুদূর নেয়া যেতো। অনেকেই আমাদের আবাদ দেখে শেখার জন্য আসেন। আমরা যতটুকু ঠেকে শিখেছি ততোটুকুই অন্যদের শেখানোর চেষ্টা করি। তবে কৃষি বিভাগ যদি অফিসিয়ালি সহযোগিতার জন্য কৃষকদের পাশে দাঁড়াতো তাহলে লাভজনক এই চাষ আরো বৃদ্ধি হতো।
অপরদিকে ফুলচাষে আশার দিকের পাশাপাশি হতার দিকও এখন আলোচনায় আসছে। চিনের তৈরি প্লাস্টিকের ফুল এখন বাজারে ছয়লাভ। ক্রেতারাও সহজলভ্য হওয়ায় প্লাস্টিক ফুলের দিকে ঝুকছেন। ওই ফুল বারবার ব্যবহার করা যায়। চাষাবাদের ফুল একবার ব্যবহারের পরেই নষ্ট হয়ে যায়। প্লাস্টিকের ফুল একবার কিনলে বহুবার ব্যবহার করা যায়। চিনের তৈরি প্লাস্টিকের এসব বাহারি ফুলের চাহিদা যদি দিনদিন বৃদ্ধি হতে থাকে তাহলে কৃষকের ফুলের উপর বৈরি প্রভাব পড়তে পারে।

তারপরও প্রকৃতিক ফুলের কোন তুলনা হয় না। এর সাথে প্লাস্টিকের ফুলকে কোনভাবেই মেলাতে রাজিনন রুচিশীল মানুষরা। তারা মনে করেন প্রাকৃতিক ফুলের চাহিদা কোন দিন কমবে না বরং বৃদ্ধি পাবে। এমন আশা থেকেই বগুড়া জেলাসহ আশেপাশের জেলাগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলচাষের প্রতি ঝুকছেন চাষিরা। বিশেষ করে তরুণ চাষিদের মধ্যে ফুলচাষের আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। পড়াশোনা শেষ করে বেকার হয়ে বসে থাকা তরুণরা চাকরির সন্ধান না পেয়ে বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ হাতে নিচ্ছেন। তার মধ্যে ফুল চাষ অন্যতম। এমন তরুণদের যদি যথযথ প্রশিক্ষণ দেয়া যেতো তাহলে কৃষিতে ফুলকে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা যেতো বলে মনে করেন অনেকে।
মন্তব্য