বগুড়া সদর আসনে একাদশ সংসদে হ্যাট্রিক ভোট , তলানীতে আওয়ামী লীগ আলোচনায় স্বতন্ত্রপ্রার্থী

প্রতীক ওমর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া সদর আসনে ভোটের হ্যাট্রিক হতে যাচ্ছে। এক সেশনে তিন বার নির্বাচন হওয়ার ইতিহাস এর আগে এখানে কখনো ছিলোনা। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হন। পরে দলীয় সিদ্ধান্তে তিনি শপথ নেননি। ফলে ২০১৯ সালের ২৪ জনু উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ নির্বাচিত হন। সম্প্রতি তিনিও দলীয় সিদ্ধান্তে বিএনপির অন্যান্য সাংসদদের সাথে গেলো ১০ ডিসেম্বর ঢাকা মহাসমাবেশে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পরে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবারো আসনটি শুণ্য ঘোষণা করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। ফলে পুণরায় আগামী ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হতে যাচ্ছে আসনটিতে। এনিয়ে রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে নানা গুঞ্জন। মাত্র এক বছর বা এক বছরের কম সময়ের জন্য কে হতে যাচ্ছেন বগুড়ার সাংসদ সেই হিসাব নিকাশ চলছে অন্দরমহলে।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি থাকছে না। নিবর ভূমিকায় আছে জামায়াত। মহাজোটের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ক্ষীণ পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। জাতীয় পার্টির নূরুল ইসলাম ওমর মহাজোট থেকে প্রার্থী হচ্ছেন এমন উড়োখবর শোনা গেলেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক মানবজমিনকে বলেছেন বগুড়া-৬ আসনের প্রার্থী কাকে দেয়া হবে সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত নূণ্যতম কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। কেন্দ্রীয় সম্মেলন শেষে এব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে।

এদিকে বগুড়ার প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার আব্দুল মান্নান আকন্দকে নিয়ে আলোচনা জমে উঠেছে। তিনি নানা কারণে বগুড়ায় আলোচিত হয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বগুড়া পৌরসভায় মেয়র পদে এবং জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে অংশ নিয়ে মাতিয়ে তুলেছিলেন বগুড়ার মাঠ। রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে তিনি স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে দাঁড়িয়ে ৫৬ হাজার ভোট পেয়ে তাক লাগিয়েছিলেন বগুড়ার রাজনৈতিক বোদ্ধাদের। ওই ভোটে তিনি বিএনপি প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশার কাছে পরাজিত হন। পরে জেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে খোদ সরকারদলীয় প্রার্থী এবং নেতাকর্মীদের রোশানলে পড়েন তিনি। একটি মামলায় পুরো নির্বাচনকালীন কারাভোগ করতে হয় তাকে। কারাগারে থেকেও তিনি আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব সংকট তৈরি করেছিলেন। ওই ভোটেও সামান্য ব্যবধানে তিনি পরাজয় বরণ করেন। তবে ভোটার এবং সাধারণ মানুষ অনেকটা জোর দিয়ে বলেছেন মান্নান আকন্দ যদি নির্বাচনের মাঠে থাকার সুযোগ পেতো তাহলে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়ে যেতেন। সেই মান্নান অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারো নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এবার জাতীয় সংসদের যাওয়ার স্বপ্ন তার চোখেমুখে জ্বলজ্বল করেছ। শুধু ঘোষণাই নয় রীতিমত রাত দিন একাকার করে মানুষের দাঁড়ে দাঁড়ে যাচ্ছেন। তাদের সাথে কথা বলছেন। তাকে নিয়ে এবারো অন্য প্রার্থীরা সংকটে পড়বেন বলে মানুষমুখে আলোচনা চলছে।

এদিকে আওয়ামী লীগ পরপর টানা তিন বার সরকারে থাকা অবস্থায় বগুড়ায় তাদের ভোট প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালের ৯ম সংসদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি মরহুম আলহাজ মমতাজ উদ্দিন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৭৪ হাজার ৬৩৪ ভোট পান। এরপর থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগের ভোট ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ২৪ জুনের উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ৮৯ হাজার ৭৪২ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টি জামান নিকেতা পেয়েছেন ৩২ হাজার ২৯৭ ভোট। অর্থাৎ ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগের ভোট কমেছে অর্ধেক। এবারে যদি আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় প্রার্থী দেয়, সেক্ষেত্রে সংখ্যায় কততে নামবে বা উঠবে অগ্রিম ধারণা করা মুশকিল। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী আরো কমবে বলে মনে করছেন বিরোধী পক্ষ।

আলোচনায় তুঙ্গে থাকা স্বতন্ত্রপ্রার্থী আব্দুল মান্নান আকন্দ বলেন, আমি সাধারণ মানুষের এমপি হতে চাই। যারা চলমান গণবিরোধী রাজনীতি থেকে মুখ ফিরে নিয়েছেন তারাই আমার শক্তি, তারাই আমার ভোটার। দুই বড় দলের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষ প্রায় শেষ হয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই আমি এমপি হতে চাই। তিনি মনে করেন এখানে আওয়ামী লীগের ভোট একেবারেই তলানীতে। বিএনপি মাঠের বাইরে। জামায়াত চুপচাপ। অপরদিকে আমার নিজস্ব ভোটাররা পুরোদমে স্বক্রীয়। আমার নিরপেক্ষ ভোটাররাই আমাকে নির্বাচিত করবেন। তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, আমি যদি নির্বাচনে না যাই তাহলে বগুড়ায় ৩ শতাংশের বেশি ভোট পড়বে না। আমি থাকাতে নির্বাচনে লোকজন উৎসবমুখরভাবে উপস্থিত হবেন। সেক্ষেত্রে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তার সাথে বিগত নির্বাচনগুলোতে যা করা হয়েছে এবারের নির্বাচনেও তেমনটা করা হতে পারে। কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকছে না এমন ঘোষণা নির্বচন কমিশন থেকে জানানোর পর তিনি নির্বাচনের নিরোপেক্ষতা এবং নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং স্বতন্ত্র থেকে আসনটিতে আরো বেশ কয়েকজনের নাম ইথারে ভাসছে। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি টি জামান নিকেতা, বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু, কোষাধ্যক্ষ মাসুদুর রহমান মিলন, বাংলাদেশ যুব মহিলালীগের বগুড়া জেলা সভাপতি এ্যাডভোকেট লাইজিন আরা লিনা। এ ছাড়া জেলা জাতীয় পার্টির বগুড়া জেলার সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম ওমরে নাম শোন যাচ্ছে।

এদিকে আব্দুল মান্নান আকন্দের পাশাপাশি স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে সোস্যাল মিডিয়ায় শুভাকাঙ্খিদের ওয়ালে দেখাচ্ছে ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা বীরমুক্তিযোদ্ধা আহসানুল হক মিনুর নাম।
নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করবেন কিনা জানতে চাইলে এই অভিনেতা মানবজমিনকে বলেন, আমি রাজনৈতিক দলের বাইরে স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করবো। আমার শুভাকাঙ্খি মহলের সাথে কথা বলেছি। আপাতত নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছি।
কথা হয় বাংলাদেশ যুব মহিলালীগের বগুড়া জেলা সভাপতি এ্যাডভোকেট লাইজিন আরা লিনার সাথে। তিনি মানবজমিনকে জানান, আমি দীর্ঘদিন থেকে রাজনীতির সাথে জড়িত। সফলভাবে ছাত্র রাজনীতি শেষ করে যুব মহিলালীগের বগুড়া জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে হালধরি এবং ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সফলভাবে দায়িত্বপালন করি। পরে পুনরায় কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা সভাপতি নির্বাচিত হয়ে এখন পর্যন্ত দায়িত্বপালন করে আসছি। আমি শুন্য হয়ে যাওয়া বগুড়া সদর আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি শতভাগ বিজয়ী হবো এবং আওয়ামী লীগের চলমান উন্নয়ণে ভূমিকা রাখতে পারবো।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক মানবজমিনকে বলেন, কেন্দ্রয়ী সিদ্ধান্ত যদি আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় তাহলে অবশ্যই আমি দলীয় মনোনয়ন চাইবো। বগুড়ায় আওয়ামী লীগের ভোট কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভোটের ক্ষেত্রে অবশ্যই সাধারণ মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাসের জায়গা ঠিক রেখে প্রার্থী নির্বাচন করা জরুরি। বিগত সময়গুলোতে হয়তো জনগণের আশানুরুপ বিশ্বস্থ প্রার্থী ছিলোনা, সেকারণে ভোট কমেছে। তিনি মনে করেন নির্ভরযোগ্য প্রার্থী দিলে অবশ্যই জনগণ ভোট দেবে এবং আওয়ামী লীগকে জয়ী করবে।

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *