ভাত ভর্তাতেই জীবন পার, মাংস জোটে কুরবানি ঈদে

প্রতীক ওমর

দুর্গম চর। পায়ে হেটে আর নৌকায় যাতায়াত ছাড়া পথ নেই। বালির উপর দিয়ে হেটে অথবা বর্ষাকালে নৌকাতেই ভরসা। শহর থেকে বহুদূরের পথ। নদীর পরে চর আবার নদী আবার বিতৃর্ণ এলাকাজুড়ে বালি। এভাবেই যমুনার অববাকিয় চরে পর চর গড়ে উঠেছে। গড়ে উঠেছে জনবসতি। নানা প্রতিককূলতাকে বরণ করে এসব চরের মানুষ জীবন পাড়ি দেয়। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা অববাহিকায় গড়ে একটি চরের নাম বানিয়ারপাড়া। সেখানে সরকারি অর্থায়নে টিনসেডের একটি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। সেখানে প্রায় শতাধিক দরিদ্র পরিবারের বাস। রাষ্ট্রিয় মৌলিক অধিকারগুলো তারা কতটুকু পাচ্ছে সেই খোঁজ নিতে মানবজমিনের এই প্রতিবেদক সরজমিন বানিয়ারপাড়া গ্রামে যায়। সেখানকার বাসিন্দারে সাথে কথা বলে জানাযায় তাদের দুর্দশার কথা। শিক্ষা, স্বাস্থ্যে অবস্থা করুণ। খাদ্য এবং বাসস্থান উভয়ই কোন রকম জীবন চলে যাওয়ার মত। ভাত ভর্তা আর শাক-সবজি খেয়েই জীবন ধারণ করেন তারা। মাংস জোটে কুরবানির ঈদে। নদীর পশ্চিমপাড়ের সামর্থবান বাসিন্দাদের পাঠানো মাংসে ওই সময় দুই এক বেলা খাওয়া হয়। এছাড়া মৌসুমী ফলের দেখা পায় না বেশির ভাগ চরের মানুষ। কখন কোন ফলের মৌসুম আসে যায় তারা টেরই পায় না। চরে ফলের গাছ কম থাকায় এবং অর্থের অভাবে শহর থেকে ফল কিনে খাওয়ার সামর্থ নেই অনেকের। ফলে বছরে একবারও তাদের পেটে ফলের রস পড়ে না।


পুষ্টির অভাবে মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে শিশুরা। শিক্ষা কার্যক্রম থেকেও এসব শিশুরা ঝরে পড়ছে পুষ্টির অভাবে। কথা হয় বানিয়ারপাড়ার কল্পনা বেগম, কমলা বেগম, জোসনা খাতুন, মিলি বেগম, সূর্য বেগম এবং সম্রাটের সাথে। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় কি থাকে জানতে চাইলে বেশির ভাগ উত্তর আসে ভাত ভর্তার সাথে শাক সবজি। যারা মুরগি পালে তাদের কপালে মাঝেমধ্যে ডিম জোটে। বর্তমানে ডিমের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় না খেয়ে টাকার প্রয়োজনে বিক্রি করে থাকেন। শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার জোগান দেয়ার সামর্থ নেই প্রায় মানুষের। জন্মের পর মায়ের বুকের দুধও পায় না অনেক শিশু। কারণ মায়েদেরও পুষ্টির অভাব চরমভাবে লক্ষণীয়। এসব শিশুদের ভাতের মার, আটা ময়দা গুলে খাওয়ানো হয়। ফলে শারীরীকভাবে র্দ্বুল হয়ে বেড়ে ওঠে। স্কুলের পড়ালেখাও মাথায় সহজে ঢোকেনা। একারণেই চরের শিশুরা প্রাথমিকেই শিক্ষা জীবন থেকে সড়ে পরে।
চরের এসব মানুষদের ভাস্যমতে নিজেদের উৎপাদিত ফল ফসল ছাড়া অন্য কিছু নিনে খাওয়ার সামার্থ নেই অনেকের। আপেল, কমলা, খেজুর, আঙ্গুর সহজে পাওয়া যায় না চরগুলোতে। ক্রেতার অভাবে ব্যবসায়ীরাও এসব রাখেনা দোকানে। তবে আম কাঠাল কলা স্থানীয়ভাবেই কিছুটা হয়। ফলে এসব ফল মৌসুমে খেতে পারে তারা।


শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিশু মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ মোঃ রফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ‘শিশুরা যদি পুষ্টিহীনতায় ভোগে তাহলে তাদের ব্রেন ডেভলভমেন্ট হয় না। একটি শিশু যদি জন্মের ছয়মাস মায়ের বুকের দুধ ঠিক মত না পায় তাহলে তাদেরকে বাইরের খাবার খাওয়ানো হয়। সেক্ষেত্রে দেখা যায় গরীব মানুষরা তাদের শিশুদের আটা ময়দা পাতলা করে গুলো খাওয়ায়। এতে ওই শিশুর ক্যালোরি ঘারতিতে পড়ে যায়। ফলে ওই শিশুদের ওজন বৃদ্ধি পায় না। আবার ছয় মাস পর শিশুদের বুকের দুধের পাশাপাশি ডিম কলিজা গাভীর দুধ খাওয়ানো প্রয়োজন। চরের বেশির ভাগ মানুষ তাদের সন্তানদের এসব খাবার দিতে পারে না। ফলে তারা মেধাহীন হয়ে বেড়ে ওঠে’। তিনি আরো বলেন, ‘পুষ্টির অভাবেই চারের বেশির ভাগ শিশু স্কুলের লেখাপড়া ধরে উঠতে পারে না। ফলে তারা শিক্ষা কার্যক্রম থেকে প্রাথমিকেই ঝরে পড়ে’।
ডাঃ রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, ‘শিশুর জন্মের তিন মাসের মধ্যে মেধার বিকাশ ঘটে। এসময় শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির উপকরণ দেয়া দরকার। পুর্টিন, কার্বহাইড্রেড, ফ্যাট, মিনারেল, ভিটামিট এগুলো যদি ঠিকমত না পায় তাহলে ব্রেনের ডেভলভমেন্ট হবে না’।
এদিকে লাগামহীন দ্রব্যমূলের কাছে চরের এসব নিম্নআয়ের মানুষরা অনেকটা পরাজয় বরণ করেছেন। আয় না বাড়া এবং কর্মহীনতা এক সাথে পৃষ্ট করছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এসব মানুষদের। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ছিটে ফোটাও এসব অঞ্চলগুলোতে পড়তে দেখা যায় না। এনজিওদের ব্যবসার পন্য হিসেবে এসব চরের মানুষ প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হলেও এদের ভাগ্যের পরিবর্তন সহজে হয় না। চরের মানুষের জন্মই হয় প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করার জন্য। যুদ্ধে কেউ টিকে থাকে আবার কেউ পড়ে যায়। দেশের শহরগুলোর জনপদ যেভাবে উন্নয়নের ছোঁয়ায় প্রতিনিয়তই রুপ পরিবর্তন হচ্ছে ঠিক তার বিপরীতে চর এবং প্রত্যন্তগ্রামগুলো ক্রমেই নিম্নমানের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুধা নিবাররণ করাই দায় হয়ে পড়েছে। সেখানে পুষ্টিকর খাবার আলাদাভাবে জোগার করা কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছে না তাদের। শিশুদের এবং গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্যসেবা ঠিকমত কেউ দিতে পারছে না।


সারিয়াকান্দির স্থানীয় কর্ণিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন দিপন বলেন, চরের মানুষদের খাবারের তালিকায় পুষ্টিকর খাবার থাকে না বলেলেই চলে। তাদের শিশু এবং নারীদের দিকে তাকালেই বোঝা যায় তারা কতটা অপুষ্টি নিয়ে বেড়ে উঠছে। মায়েদের শরীরের অবস্থাও অনেক খারাপ। তারা যখর ভঙ্গুর শরীর নিয়ে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন তখন সেই সন্তানরা পুষ্টিহীনতায় ভুগবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, চরের নিম্ন আয়ের এসব মানুষদের খাবার তালিকায় পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিৎ করতে বিভিন্ন এনজিও, সরকার সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এগিয়ে আসা দরকার।

 

 

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *