প্রতীক ওমর, উত্তরাঞ্চল ঘুরে:
উপেক্ষিত অঞ্চল। বাংলাদেশ জন্মের পর থেকেই ‘অবহেলিত’ ‘মঙ্গা’ এসব বিশেষণমূলক শব্দ নামের আগে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে উত্তরজনপদের বেশ কিছু জেলার সাথে। গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় বরাবরেই দেশের কর্তাদের দৃষ্টিতে অবহেলায় আটকে আছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈকিত প্রেক্ষাপট খুব বেশি পাল্টেতে দেখা যায়নি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও। রাষ্ট্রিয় সুযোগ সুবিধার ছিটে ফোটা মাত্র পড়ে এই অঞ্চলের মানুষদের কপালে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান কোন কিছুতেই তেমন আগ্রহ চোখে পড়ে না সরকারের। সাম্প্রতিক সময়ে পথ-ঘাট, সরকারি কিছু অবকাঠোগত উন্নয়ণ দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলে কোন পদক্ষেপ শুন্যের কোঠায়। এই অঞ্চলের মানুষরা তাদের ভাগ্য বদলে নিজেদের শরীরকে কাজে লাগিয়ে আসছে বংশপরামপরায়। কৃষি ক্ষেত্রই এদের মূল আয়ের পথ। বাপ দাদার পেশাকেই আকড়ে ধরে জীবিকার সন্ধান করে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই অঞ্চলের মানুষদের কর্মমূখি প্রশিক্ষণ অথবা শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে উন্নত জীবনযাপনের পথ বাৎলে দেয়ার উদাহরণ সীমিত। বহুবিধ সমস্যা মাথায় নিয়ে এখানকার মানুষ পথ চলে। গায়ে গতরে খেটেই জীবিকা অন্বেষণ করে। কখনো ধানের ক্ষেত, কখনো তামাকের মাঠে শ্রম বিক্রি করেন বেশির ভাগ মানুষ।

এসব কাজের পাশাপাশি সাম্প্রতিক কিছু বছরধরে যুক্ত হয়েছে নদী থেকে পাথর কুড়ানোর কাজ। পঞ্চগড় জেলাতেই কেবল দেখা মেলে পাথর কুড়ানো মানুষদের। দেশের সর্ব উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়ার উপর দিয়ে বয়ে গেছে মহানন্দা নদী। ভারতে উৎপত্তি এই নদীর দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। গড় প্রস্থ ২০০ মিটার। এই নদীতে প্রচুর পরিমণ নুড়ি পাথর পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সেই পাথর কুড়িয়ে সংসার চালাচ্ছে এখন।
পঞ্চগড় শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ। প্রত্যন্ত গ্রাম ভেদ করে নিরিবিলি বয়ে চলেছে পিচঢালা পথ। গ্রামের পর গ্রাম। দুই ধারে কৃষকের সফল ভরা মাঠ। সবুজ প্রকৃতি। গাছগুলো ছায়াময় হয়ে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দূরপাল্লার যান খুব কম। দিনের বেলা লোকাল কিছু পরিবহন ছাড়া রাস্তা প্রায় বাহন শুন্য থাকে। বাইকে চেপে পঞ্চগড় শহর থেকে রওনা হই তেঁতুলিয়ার পথে। চালক মাহমুদুর হাসান মামুন। একজন এনজিও কর্মকর্তা। স্থানীয় হওয়ায় পথঘাট দেখানোসহ সার্বিক সহযোগিতা করেছেন তিনি। সকাল সাড়ে আটটায় রওনা হই। মেঘের আড়ালে সূর্য তখনো শক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করেনি। পুরো আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। সবেমাত্র ঘুর্ণিঝড় ‘অশনি’ কেটেছে। তার প্রভাব মুক্ত হয়নি জলবায়ুতে। পুরো আকাশে পাতলা মেঘে ঢাকা। নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ। উপভোগ করার মত। সড়ক ফাঁকা। বাইকের গতি ৮০/৮৫। অল্প সময়ের মধ্যেই ৪০ কিলোমিটার পথ শেষ হয়ে যায়। তেঁতুলিয়া জিরো পয়েন্টে পৌছে বাইক থেকে নেমে পড়ি আমরা। চায়ের দোকানে দাঁড়াই। রঙ চায়ের স্বাদ নিতে নিতে কথা হয় স্থানীয়দের সাথে। পাথর শ্রমিকদের বিষয় জানতে চাই। উৎসুক কয়েকজন তাদের গল্প শোনালেন। কাক ডাকা ভোরে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদী সাথে নিয়ে ছুটে চলে মহান্দার দিকে। ধীর পায়ে কোমর পানিতে নেমে পড়েন শ্রমিকরা। লোহার তৈরি এক প্রকার চালানি, কোদাল এবং বড় ট্রাকের টায়ার তাদের মূল উপকরণ। পানির নিচে চালানি দিয়ে টেনে তুলতে হয় নুড়ি পাথর। কোথাও হাটু পানি কোথাও কোমর আবার কোথাও আবার বুক পানি মহান্দায়। শুস্ক মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকায় পাথর তুলতে বেশি সুবিধা হয়। এজন্য এই সময়টাকেই বেছে নেয়া হয় পাথর উত্তোলনের জন্য। বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও এখনো নদীতে পানি আসেনি। ফলে এখনো দিব্যি চলছে পাথর উত্তোলনের উৎসব। তেঁতুলিয়া জিরো পয়েন্ট থেকে পুরাতন বাজার রাস্তা ঘেষেই মহানন্দা বহমান।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, মহানন্দা পাড়ের বাংলাবান্ধা, পাগলিডাঙ্গী, সন্যাসীপাড়া, উকিলজোত, খয়খাটপাড়া, ইসলামপুরসহ আশপাশের প্রায় ৪০টি গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা এই পাথরের উপর নির্ভর। তেঁতুলিয়া এই অংশের মাত্র কয়েক কিলোমিটার নদীতে এই অঞ্চচলের প্রায় ৩০ হাজার প্রান্তিক মানুষ প্রতিদিন পাথর উত্তোলণ করেন। শুধু মহানন্দাই নয়, করোতোয়া এবং ডাহুক নদী থেকেও পাথর উত্তোলন করছেন এই অঞ্চলের মানুষ। পানিতে নেমে দলবদ্ধভাবে পাথর উত্তোলনের দৃশ্য দেখার জন্য তেঁতুলিয়া পয়েন্টে বছরজুড়ে পর্যটকদের দেখা মেলে। নদীটি পুরো অংশ ভারতের মধ্যে হওয়া পর্যটকদের নামতে দেয়া হয় না। শ্রমিকদের সাথে মৌখিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ওপরের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশী পাথর শ্রমিকদের নামতে দেয়। তবে নদীর বাংলাদেশী কিনারা অংশের মধ্যেই তাদের পদাচারণা সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। মাঝ নদীতে গেলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী এসব পথুরে মানুষদের ধাওয়া করে। বন্দুকের নালা সব সময় তাক করে বসে থাকে বিএসএফ। জীবননাশের শঙ্কাকে উপেক্ষা করেই এখানকার মানুষ প্রতিদিন মহানন্দার বুকে জীবিকা খোঁজেন। বাংলাদেশী সীমানাতেও বিজিবি টহলরত অবস্থায় আছে সার্বক্ষণিক। পর্যটকদের সাবধান করে থাকেন তারা। সীমানা পার হতে দেয় না। শ্রমিকদের সাথে কথা বলতে হবে। তাদের জীবন জীবিকার গল্প শুনতে হবে। খুব কৌশলে অল্প সময়ের জন্য পাথর শ্রমিকদের কাছে গিয়ে কথা বলি। স্থানীয়বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম। তিনি মানবজমিনকে জানান, সকাল থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত মহানন্দায় পাথর উত্তোলন করেন। সারা দিনে যে পাথর জমা হয় তা স্থানীয় মহাজনদের কাছে বিক্রি করে ৫শ’ থেকে ৭শ’ টাকা পান। এলাকায় অন্যকোন কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই নদী থেকে পাথর উত্তোলণের কাজ বেঁছে নিয়েছেন।
আকাব্বর আলী মানবজমিনকে জানান, আমাদের এলাকায় গার্মেন্টস অথবা বড় কোন শিল্পকারখানা নেই। ফলে আমাদের মত হাজার হাজার মানুষ অনেকটা কর্মহীন হয়ে আছে। উপায় না পেয়ে মহানন্দায় পাথর তুলি। দিন শেষে ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা বিক্রি করে সংসার চালাই।
এবার পঞ্চগড় শহরের পাশেই রাজনগর খালপাড়া এলাকার করতোয় নদীর একটি স্পর্টে গিয়ে কথা বলার চেষ্টাকরি ওখানকার পাথর শ্রমিকদের সাথে। তারাও নানা জটিলতার কথা শোনালেন অকপটে। তাদের একজন জাহাঙ্গীর আলম। দীর্ঘদিন থেকে তিনিও নদী থেকে পাথর উত্তোল করেন। জীবন-জীবিকার একমাত্র মাধ্যম তার এই কাজ। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া, ওষুধ কেনা, ঘরবাড়ি মেরামতসহ সংসারের খরচ সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দিন যাচ্ছে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের মত গরীব মানুষ ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। পাচ বছর আগে মহাজনরা যে দামে পাথর কিনেছে এখনো সেই দামেই আমাদের থেকে কিনছে। আমরা অনেকটা বাধ্য হয়েই কমদামে মহাজনদের হাতে এসব পাথর তুলে দেই।
একই এলাকার একজন নারী শ্রমিক অলিমা বেগম। তিনি জানান, কোদাল দিয়ে পাথর তুলতে কোমরে ব্যাথা হয়েছে। বয়সের ভারে এখন আর ঠিকমত কাজ করতে পারি না। মাঝমধ্যে হোটেলে রান্নার কাজ করি। যখন হোটেলে ডাকে না তখন বাধ্য হয়ে আবার নদীতে নামি পাথর তুলতে। কিছুই করার নেই। পেটের ক্ষুধা মেটাটেই এমন কষ্টের কাজ বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বয়স্ক ভাতার একটা কাড পেয়েছেন একবছর আগে। সেই কার্ডের টাকা অন্যকেউ প্রতারণা করে নিয়মিত তুলে নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে মৌখিক অভিযোগ দিয়েও কোন সুরাহা পাননি তিনি। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে।
এদিকে পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়া, বাংলাবান্দা পর্যন্ত বহু পাথর প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে উঠেছে। কারখানাগুলোতে এসব পাথর বিভিন্ন সাইজে আলাদা করা হচ্ছে। বড় পাথর ভেঙে ছোট করা হচ্ছে। সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাচ্ছে পাথর। রাস্তা-ঘাট অবকাঠামো নির্মাণে এসব পাথরের বড় একটা বাজার রয়েছে। নদী থেকে পাথর উত্তোলনকারীদের থেকে কমদামে এসব পাথর কিনে মিলমালিকরা প্রক্রিয়াজাত করে বেশি দামে বিক্রি করছেন। শ্রমিকদের ভাগ্য নিম্নমুখি হলেও মহাজনদের ভাগ্যের চাকা এদের হাত দিয়েই সামনের দিকে যাচ্ছে।
পঞ্চগড়ের কৃষিতে নতুন করে যোগ হয়েছে চা বাগান। ছোট বড় অনেক চা বাগান ইতোমধ্যেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে পঞ্চগড়। বেশ কিছু নামীদামী কোম্পানি চা চাষ এবং প্রক্রিয়াজাত করছে পঞ্চগড়ে। এখানেও অবহেলিত হয়ে আছে চা শ্রমিক এবং সাধারণ চা চাষিরা। চায়ের বাগানে বেশির ভাগ উপজাতি সম্প্রদয়ের লোকজন শ্রমিকের কাজ করে থাকেন। শতশত শ্রমিক বাগানগুলোতে এখন চা পাতা তুলতে ব্যস্ত।
শতভাগ মনযোগ তাদের কাজে। এদিক সেদিক তাকানোর সময় নেই তাদের হাতে। বাইরের মানুষের সাথে কথা বলা বারন। শ্রমিকদের একজন সরদার থাকে। শ্রমিকরা তাদের মুন্সি বলে থাকে। ওই মুন্সি যদি দেখে ফেলে তাহলে কারো সাথে কথা বলতে তাহলে তার উপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। ফলে ভয়ে কোন শ্রমিক সহজে মুখ খুলতে চায় না। একটি চা বাগানে কিছু নারী শ্রমিকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে তারা এসব তথ্য দিয়ে দ্রুত সরে যান। সে সময় তারা বলেছেন সারাদিন কাজ করে তারা ২০০ টাকা মজুরি পান। ওই টাকা দিয়ে কোন রকম সংসারের খরচ চালায় তারা।
অপরদিকে বড় কোম্পানিগুলোর দাবার চালে সাধারণ চা চাষিরা বরাবরেই ক্ষতির মধ্যে পড়ছেন। তাদের উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে দাম খুব কম পাচ্ছেন তারা। ওই অঞ্চলে প্রতিনিয়তই ক্ষোভে সাধারণ কৃষকরা রাস্তায় চা পাতা ফেলে বিক্ষোভ করছেন। তাদের সেই বিক্ষোভে কারো কোন পদক্ষেপ লক্ষ্যকরা যায়নি। এভাবে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে তারা চা চাষ করা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। তখন কোম্পানিগুলো এককভাবে চায়ের বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে।

গোটা উত্তরাঞ্চল কৃষি নির্ভর। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি সব কিছুর জোগান দেয় উত্তরের কৃষকরাই। সেই কৃষকদের পাশে নেই কেউ। মধ্যসত্ত্বভোগীদের দাপটে সব ধরণের কৃষক পিষ্ট হয়ে প্রায় অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ববরণ করেছে। জমিতে চাষ দিয়ে কষ্টে সফল ফলায় কৃষক আর স্যুট-টাই পড়া ভদ্র ব্যবসায়ীরা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন। জমিতে থেকে সফল তুলে কৃষক দাম পাচ্ছে না। সেই পণ্য ঠিকই আড়তে গিয়ে দুইগুণ তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন খরচের লাগামহীন বৃদ্ধি আর সফলের দাম কম হওয়ায় প্রতিবছর লাখ লাখ কৃষক অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে।
গাইবান্ধা এলাকার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা জাহিদ খন্দকার বলেন, তিনি গেল তিন বছর ধরে কৃষি ফার্ম করেছেন। তার ফর্মে বিভিন্ন ধরণের ফসলের চাষ করছেন। তিনি কৃষির অভিজ্ঞার আলোকে বলেন, কাউকে যদি অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার চিন্তা করা হয় তাকে কৌশলে আবাদমুখি করাতে হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কৃষি উৎপাদনে যে পরিমাণ খরচ অনেক সময় তার আশি ভাগও সফল বিক্রি করে উঠে আসে না। তিনি তার ফার্মে তিন বছরে কয়েক লাখ টাকা লোকশান গুণেছেন।
এভাবই উত্তরজনপদের সাধারণ মানুষ বরাবরেই অবহেলার শিকার হয়ে আসছেন। এখানকার কৃষিতে গোটা দেশের চাহিদার একটা বড় অংশ পুরণ হলেও সেই উৎপাদনকারীদের ভাগ্যের উন্নয়ণ কেউ কোন দিন করতে আসেনি। এঅঞ্চলের নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে। নারী উন্নয়ন নিয়ে নানামুখি সরকারি পদক্ষেপের কথা শোনা গেলেও অবহেলি এই অঞ্চলের নারী সমাজের ভাগ্যে জোটেনি সে সব উন্নয়নের ছোঁয়া। স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈশম্যের শিকার উত্তরাঞ্চলের মানুষ। নদী অধ্যশিত এলাকাগুলোর প্রত্যন্ত চরের মানুষ এখনো ভালো চিকিৎসা পাচ্ছে না। হাসপাতাল নেই। ভালো ডাক্তার নেই। ঝাড় ফুঁ আর কবিরাজি চিকিৎসাই তাদের একমাত্র ভারসা। দেশের অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে উন্নয়নের ছোঁয়া লক্ষ্যকরা গেলেও এই অঞ্চলে দেখা যায় ছিটেফোটা মাত্র। উন্নয়ন বৈশম্যের শিকার উত্তরজনপদ। প্রত্যেক সরকারই এই অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে শক্তভাবে ভাবেনি। ফলে দিনের পর দিন এই অঞ্চলটি অবহেলিত হয়েই রয়েগেছে।
বাণ্যিজিক এলাকা তৈরির উদ্যোগও চোখে পড়ে না তেমন। ব্যক্তি উদ্যোগে যতটুকু সম্ভব হয়েছে ততটুকুই কোন রকম টিকে আছে। বগুড়ায় বিমানবন্দর প্রস্তুুত আছে। শুধুমাত্র চালুর ঘোষাণর অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এই সরকার অনেকটা চোখবুজে তাকায় বগুড়ার দিকে। ফলে মন গলেনা। উন্নয়নে বাজেটও বারে না।
উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন, কথা বলেন, এমন একজন সচেতন নাগরিক ডাক্তার এ এইচ এম মশিহুর রহমান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, কয়েক বছর আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার আলতাফুন্নেসা খেলার মাঠে জনসভায় কথা দিয়েছিলেন বগুড়াকে বিভাগ করার। তিনি সেই কথা রাখেন নি। জনগণের সামনে দেয়া ওয়াদা রক্ষা করেননি। তিনি মূলত বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষদের সাথে বিমাতা সুলভ আচরণ করছেন। তিনি মনে করেন, এই অঞ্চলের জনগণের মনে এখন একটাই প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রী কি তাহলে আমাদের ভালোবাসেন না? নাকি হিংসার রাজনীতি করেন?
ডাক্তার এ এইচ এম মশিহুর আরো বলেন, অখ্যাত জায়গাগুলোতে এই সরকার বিশ^বিদ্যালয় করার উদ্যোগ নিয়েছে, কিছু জায়গায় করেছে অথচ বগুড়ার মত একটা বড় জায়গায় পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় দিচ্ছে না। এছাড়াও এই অঞ্চলের শিক্ষিত বেকার যুবকদের সরকারি চাকরি সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই এই অঞ্চল পুরো অন্ধকার হয়ে আছে। বগুড়ার বিমানবন্দর নিয়ে জোরালো কথা বলা হয়েছে কিন্তু চালুর ঘোষণা দিচ্ছে না। বগুড়া সিরাজগঞ্জ রেল লাইন স্থাপন সেটিও অনেকটা মূলা ঝুলোনোর মতই মনে হচ্ছে। সম্ভাবনাময়ী এই অঞ্চলকে সরকার যদি হিংসা ছেড়ে উন্নয়নের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয় তাতে দেশের অর্থনীতির চাকা আরো গতিপাবে বলে তিনি মনে করেন।
কেন উত্তরজনপদ বরাবরের মত আজও উন্নয়ণ বঞ্চিত, কেন এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তন হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিলাম রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের আইবিএ বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসানাত আলীর কাছে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, বেশ কিছু কারণে উত্তরাঞ্চল উন্নয়ন বঞ্চিত হয়ে আছে। এসব কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে, উত্তরাঞ্চলের নেতৃত্বের ব্যার্থতা সর্ব আগে কারণ। রাষ্ট্রের প্রধান চালিকা শক্তি সচিবালয়ে বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চল বিদ্বেশী কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি। তারা কোন ভাবেই চায় না এই অঞ্চলের উন্নয়ন। এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের অন্তরায় হয়ে কাজ করছেন তারা। এছাড়াও তিনি মনে করেন, স্বাধীনতার আগে এবং পরে অনেক দেশ বরেণ্য নেতা এই অঞ্চলে ছিলেন। যেমন মোহাম্মদ আলী, শহীদ জিয়াউর রহমান, হুশাইন মুহা: এরশাদ এছাড়াও বেগম খালেদা জিয়ার মত নেতৃত্ব এখাই অঞ্চলে ছিলো। তারাও যে অর্থে এই এলাকার উন্নয়ন করার কথা ছিলো সেই অর্থে উন্নয়ন করেননি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ভালো নেতারা যেভাবে নিজ এলাকার উন্নয়ণ করেছেন সেভাবে কোন দিনই উত্তরাঞ্চলের নেতারা করেননি। অথচ এই অঞ্চলের উল্লেখিত নেতারা সর্বচ্চো ক্ষমতাধর ছিলেন।
গেলো কয়েক দিন উত্তরজনপদের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুড়ে রাস্তাঘাটের দৃশ্যমান উন্নয়ন চোখে পড়েছে। সড়কে অসংখ্য বড় সেতু সির্মাণ হয়েছে প্রান্তিক এলাকাগুলোতে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই সব উন্নয়নে নিজেদের পরিবর্তন করার মত কোন উপকরণ পায়নি। কৃষকদের উন্নয়ন, শ্রমিকদের উন্নয়ন, শিক্ষিত বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। আকাশ পথের যাতায়াতের অভাবে উত্তরের প্রাণকেন্দ্র বগুড়াতেও ভারি শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে না। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সড়কপথের যানজট ঠেলে এই অঞ্চলে পরিদর্শনে আনারও কোন সুযোগ নেই। সম্পূর্ন প্রস্তুত অবস্থায় বগুড়া বিমানবন্দনটি দীর্ঘদিন থেকে পড়ে আছে। সেটি চালুর উদ্যোগে কেউ মাথা দেয় না। এলাকার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ সব শ্রেণিপেশার মানুষ বিমানবন্দরটি চালুর ব্যপারে জোড়ালো কথা বললেও রাষ্ট্রিয়ভাবে কোন কাজ হচ্ছে না। ফলে সবার ধারণা বর্তমান সরকার হয়তো ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে কখনো শপথ করেছেন তাদের আমলে বগুড়া বিমানবন্দর চালু না করা জন্য।
মন্তব্য